Wednesday, September 14, 2011

এগার

অনিক, নিশি, আর ইরফানকে একসাথে পেয়ে গেলাম। ওরা আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমার বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে ওরা অবাক হয়ে গেল। রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে বিদায় করে দিল অনিক। কোন বিশ্রাম না নিয়ে ওদের সব খুলে বললাম। আমার কথা শুনে ওদের হতাশ মনে হলো।
নিশি বলল, “তোরা তো সব রহস্য উদ্ধার করে ফেলেছিস। আমাদের আর দরকার কি ?”
“এখন তোদেরই দরকার সবচেয়ে বেশি রহস্যেও ফিনিশিংটা তোদেরই দিতে হবে। আর দেরী করার সময় নেই, কিছু একটা কর। ”
অনিক বলল, “বেঈমান কোথাকার, আমাদের মুহিদ ভাইয়ের কাছে প্রেমপত্র লিখতে পাঠিয়ে নিজেরা রহস্য সমাধান করে এসেছিস!”
“সময় নষ্ট করিসনা। ভাব, কিভাবে পুলিশ ডেকে ওদের তিনজনকে উদ্ধার করা যায়। এমনিতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। শয়তান গুলো গাঁ ঢাকা দিতে পারে। ”
নিশি বলল, “পুলিশ যখন তোর কথায় সাড়া দিল না। আমাদের উচিত অভিভাবক কারো সাহায্য নেয়া।”
ইরফান বেশ উৎসাহে বলল, “এক্ষেত্রে আমাদের হেডমাষ্টারই সর্বোত্তম। ওনি ছাড়া আর কেউ রাজি হবে না। ”
“ঠিক বলছিস। আমরা সবাই মিলে বললে দাদু কিছু একটা করতে পারে।”
আমি বললাম, “ওকে কুইকলি।”
হেডস্যার ইজি চেয়ারে বসে আরাম করে বই পড়ছিলেন।
আমাদের দেখে অবাক হয়ে বললেন, “এই অসময়ে তোমরা? কোন ঝামেল মনে হচ্ছে?”
নিশি বলল,“ঝামেলা মানে বিশাল বড় ঝামেলা। তোমাকে হেল্প করতে হবে। আমাদের তিন বন্ধু মহাবিপদে।”
“কী হয়েছে খুলে বল তো, মা!”
নিশি সবিস্তারে একে একে সব কথা বলল। আমার দুঃসাহসিকতার কথা বলতেও ভুল করল না, গর্বে আমরা বুকটা একহাত উঁচু হয়ে যাচ্ছিল। বুকটা উঁচু হয়ে যাওয়ার করনেই বোধ হয় বুঝলাম প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। কিংবা স্যারের সামনে রাখা আপেলগুলো দেখে! স্যারও বোধ হয় আমার খিদেটা বুঝলেন তাই আমায় খেতে দিলেন। কারো চেহারার দিকে না তাকিয়ে একাই সাবাড় করে গেলাম। চেহারার দিকে তাকালে যদি মায়া হয় তাহলে তো ভাগ দিতে হবে!
স্যার অবলীলায় আমাদের সব কথা বিশ্বাস করলেন। পুলিশ অফিসারের কান্ড শুনে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। সাথে সাথে ফোন করলেন ওসিকে এবং এক্ষুণি আসতে বললেন। কিছুক্ষণের ভিতর গাড়িসহ পাঁচজন পুলিশ এসে হাজির। পুলিশ অফিসার মিঃ নান্নু আমায় দেখে যেন কেমন করলেন।
তারপর বললেন, “স্যার,আপনিও এই বাচ্চা পোলাপানদের কথা বিশ্বাস করেছেন?”
স্যার বললেন, “তোমার দায়িত্ব হচ্ছে অপরাধীকে ধরা এর জন্য যা কিছু করার তোমার করতে হবে। এখন তোমার দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের সাথে যেতে হবে। আমার তিনজন ছাত্রকে উদ্ধার করতে হবে।”
স্যারের কথায় পুলিশ অফিসার মি. নান্নুর মুখটা কালো হয়ে গেল।
তারপর কাচুমাচু করে বললেন,“স্যার আপনি যা বলেন।”
ব্যাটা  এতক্ষণে লাইনে এসেছে।
স্যার আমায় বললেন,“শিশির, তুমি আমাদের ঐ জায়গায় নিয়ে চল।”
“তবে চলুন, স্যার।”
স্যারসহ আমরা পুলিশের জিপে গিয়ে বসলাম। পুলিশের জিপটা চলতে লাগল পাগলখাইয়া মাঠের দিকে।
যেতে যেতে স্যার বললেন, “আজ থেকে অনেক বছর আগে, এই গ্রাম থেকে সাত ক্রোশ দূরে শ্যামা আলী খায়ের জমিদারি ছিল। অত্র এলাকায় তার ভীষণ দাপট ছিল। তবে অন্যান্য হিন্দু জমিদারদের মতো অত্যাচারী ছিলেন না। ইসলাম খাঁ যখন বাংলায় আসেন তখন শ্যামা আলীর প্রাসাদে বেশ কিছুদিন অবস্থান  করেছিলেন। শ্যামা আলীর প্রাসাদও ছিল বিশাল। আশেপাশে যত সুড়ঙ্গ পাওয়া যায় সব শ্যামা আলীর প্রাসাদ থেকে বেরিয়েছে।” আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে স্যারের কথা শুনছিলাম।
পুলিশ অফিসার মি. নান্নু স্যারের সাথে যোগ দিয়ে বললেন, “শ্যামা আলীর রাজত্ব বেশিদিন টিকেনি। আশেপাশের হিন্দু জামিদাররা একজোট হয়ে তাকে তাড়িয়েছিল। শ্যামা আলীর কর্মচারী এনামূল শাহ ষড়যন্ত্রের মূলে ছিল। শ্যামা আলী সুড়ঙ্গ দিয়ে কোথায় পালিয়েছিল কেউ তার হদিশ দিতে পারে না। ”
আমি বললাম, “চোর ডাকাতরা এখন এই সুড়ঙ্গে আস্তানা গেড়েছে। ডাকাতির পর ওরা মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যায়। ডাকাতগুলো পালানোর পথ হিসাবে এই সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে।”
আমার কথার কেউ কোন জবাব দিল না ।
নিশি জিজ্ঞাসা করল, “শ্যামা আলীর প্রাসাদ কী এখনো আছে?
স্যার বললেন, “সব ধ্বংশ হয়ে গিয়েছে। লুটপাটেরা একটা ইটও বাকি রাখেনি।”

No comments:

Post a Comment