Wednesday, September 14, 2011

ছয়

ঘাড় সোজা করার যে কত পদ্ধতি আছে আমার ঘাড়টা বাকা না হলে জানতাম না। আর তা যে কখনো- সখনো অপরাধের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ প্রদত্ত হয়ে থাকে তাও হয়ত জানা হত না। আমি ঘাড়ের ব্যথায় মরছি আর একেক জন এসে একেক রকম উপদেশ দিতে লাগল।
লাজ-লজ্জা অপমানহীন রনি বলল, “ঘাড়ে ব্যাথা খুব সিরিয়াস ব্যাপার রে। খুব সহজে সারে না। আমার দূর সম্পর্কের নানীর ছেলের মার তোর মতোই ঘাড়ে ব্যথা হয়েছিল। দুই বছরেও সারেনি। তবে মোটা তক্তা দিয়ে যদি ঘাড়ের উপর ইচ্ছেমত গণদোলাই দেয়া যায় তাহলে সারতেও পারে।”
এ কী কথা! গণদোলাই দিলে যদি ঘাড়ের ব্যথা ভালই হতো তাহলে চোর-ডাকাতদের আর ঘাড়ে ব্যথা হতো না।
ধর্মভীরু নাহিদ সদ্য গজানো দাঁড়িতে হাত ভোলাতে ভোলাতে বলল,“হুম! ঘাড়ের ব্যথা তো? কোন ব্যাপার না। কাল তুই আমার সাথে কাশুগঞ্জের ল্যাংটা বাবার কাছে যাবি দেখবি এক ফুতে কম্ম সাবাড়। ঘাড়ের ব্যথা বাপ বাপ কইরা পালাইব।”
বিপক্ষ দলের তোফা বলল, “সব চালিয়াতি সাজা! শুধু ঘাড় না আল্লায় তোর মাথাও খাইব।”
আমি বললাম, “চালিয়াতি কিরে?”
তোফা মুখটা বানরের মতো করে বলল, “চালিয়াতি করে জিতেছিস আবার কথা বলছ!”
ছেলেগুলো যে কী, হেরে গেলেই বিপক্ষ দলের এই দোষ সেই দোষ খুঁজে। একদম বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের মতো। এজন্যই জাতির আজ এ করুণ অবস্থা।
অনিক আর নিশি বলল, ওরা হাসপাতালে তুরাবকে দেখতে যাবে। আমাকেও যেতে বলল। প্রথমে রাজি হলাম না পরে ঠিকই ওদের পিছু পিছু সিদ্দিককে সাথে নিয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় একটা  ডিসপেনসারিতে জিঙ্গেস করলাম, ঘাড় ব্যথার কোন ওষুধ আছে কিনা?
কী নির্মম! এই ব্যথার নাকি কোন ওষুধই নেই। ছিঃ ছিঃ করতে লাগলাম, আমাদের বিজ্ঞান এত পিছিয়ে। আরেকটা ডিসপেনসারির দোকানি মুভ না পাওয়ার বম্ভ কী মলমের কথা বলল! কিন্তু ওসব মলম-ফলমের প্রতি আমার মোটেও বিশ্বাস নেই।
একঘন্টা কী দেড় ঘন্টার ভিতর হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম। হাসপাতালের গেইটে একটা মেয়ে দেখে ভীষণ ভড়কে গেলাম। সেই সাথে আমার ঘাড় ব্যথাটাও ভাল হয়ে গেল। মেয়েটা লম্বায় কমপক্ষে ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি তো হবেই! এত লম্বা মেয়ে আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। এর জন্য ছেলে পাবে কোথায় তাই ভাবলাম!
তবে মেয়েটা আমার তো করলই সাথে মানব জাতির একটা ভীষণ উপকার করল! কারো আমার মতো ঘাড়ে ব্যথা হলে এই মেয়ের সামনে আনলে নির্ঘাত ঘাড়ের ব্যথা ফিনিস হয়ে যাবে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে হলে ঘাড়ের ব্যথা এমনিতেই ফিনিস হয়ে যাওয়া কথা। মেয়েটার মাথায় আবার ব্যান্ডেজ করা! নিশ্চয় না দেখে ছোট দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে এই হাল হয়েছে। লম্বা মানুষের বুদ্ধি কম হয় তুরাবকে দিয়ে আমি জানতাম, আজ ব্যাপারটা নিশ্চিত হলাম।
নিশিকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুই ওই মেয়েটাকে চিনিস?”
“তাল গাছের মতো যে লম্বা, ওইটা।”
“হে, ওইটা।”
“একে না চিনার কী আছে! এ তো আমাদের স্কুলেই পড়ে। দুনিয়া শুদ্ধ লোক জানে, এ বাংলাদেশের সবচেয়ে লম্বা মেয়ে। কেন, তুই একে চিনিস না।”
এর মধ্যে অনিক বলল, “ওর কথা বলিস না ও কিছুই চিনে না।”
কথাটার অবশ্য প্রতিবাদ করতে পারলাম না। কারণ আমি কী জানি বা চিনি সেটা আমি নিজেও বলতে পারব না।
হাসপাতালের দুই তলায় করিডোরের শেষ মাথায় তুরাবের কেবিন পেয়ে গেলাম। বেচারার একেবারে নাজেহাল অবস্থা করে দিয়েছে। শরীরে এখানে সেখানে ব্যান্ডেজ করা। প্যান্টটাও ঠিকমত পড়তে পারছে না। নিচের অংশ চাদর দিয়ে ঢাকা। তুরাবের মা ওর পাশে বসা ছিল, আমাদের দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। তুরাব মনে হল ঘুমিয়ে আছে।
নিশি তুরাবের মাকে জিজ্ঞাসা করল,“আন্টি এখন কী অবস্থা?”
আন্টি ঘোমটা টানতে টানতে বললেন,“কী আর অবস্থা। সবই ভাগ্যির ব্যাপার মা। তারে কতবার কইলাম যাইস না বাপ যাইস না, কোন কতা শুনলনি!”
কিছু মানুষের স্বভাবই এমন বিস্তারিত না বলে মজা পায় না। তুরাবের মায়ের স্বভাবটাও তেমন, ইতিহাস না টানলে যেন কথা সম্পূর্ণ হয় না। এ কথা সে কথার পরে মূল কথায় আসে।
এবার অনিক জিজ্ঞাসা করল, “আন্টি ওর শরীরের ব্যাপারে ডাক্তার কী বলেছে?”
তুরাবের মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “ডাক্তার আর কী কইব। শীঘ্রি শীঘ্রি ভাল হইলে অয়। আল্লায় রক্ষা করছে, হারামজাদারা বেশি জোরে ঘাই দিতে পারে নাই।”
ইতোমধ্যে তুরাব জেগে উঠেল। আমদের দেখে বলল, “কিরে তোরা?”
আমি বললাম,“এই তো  তোকে দেখতে আসলাম।”
অনিক জিজ্ঞাসা করল, “কী অবস্থা তোর?”
তুরাব কন্ঠে উদাস ভাব এনে বলল, “অবস্থা তো দেখছিস-ই ।”
তারপর আবার ইত্তেজিত হয়ে বলল, “শালাদের একবার সামনে পাই। সবগুলোকে মেরে কুত্তো দিয়ে খাওয়াব। একটুর জন্য একটা ডগ সনকে ধরতে পারলাম না।”
তুরাবের কন্ঠের ঝাঝ দেখে আমার কণ্ঠ থেকেও ঝাঝ বেরিয়ে গেল, “শুধু গলা না চুলও কেটে ছাড়ব। একেকটাকে গাছে উঠিয়ে শাখামৃগ সঙ্গীত শোনাব দেখবি পুরো গ্যাংটাকে নির্ঘাত দুই দিনের ভিতর ধরে ফেলব। তারপর বুঝবে ঠ্যালা।”
তুরাব আমার কথা বিশ্বাস করে বলল, “পারবি তো?”
এর উত্তর কী দেব ভেবে পেলাম না। আমি তো শুধু কথায় তাল মেলানোর জন্য বলেছি। সত্যিই যে ধরে ফেলব তা কে বলেছে! তাই অসহায়ের মতো অনিক আর নিশির দিকে তাকালাম। দুইটা কত বড় স্বার্থপর আমার দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেল।
আমিও ওদের উপেক্ষা করে বললাম, “পারব না কেন? তুই নিশ্চিত থাক। জানিস তো, এই শিশিরের কাছে ইমúসিবল বলতে কিছুই নেই। শালারা বেশি বেড়েছ। একেকটাকে নাকানি চুবানি খাইয়ে ছাড়ব।”
তুরাব ‘শাবাস’ বলে উঠতে গিয়ে ব্যথায় ককিয়ে আবার শুয়ে পড়ল। তারপর বলল,“আজ খেলার কি খবর? জিতেছিস তো? আমি তো খেলতেই পারলাম না।”
“জিতব না আবার। আজ খেলিস নি তো কি হয়েছে? আসল খেলা তো এখনো বাকি।”
“তা ঠিক বলেছিস। ততোদিনে সুস্থ হতে পারলেই হয়।”
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দেখলাম, মোটামুটি সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। পাখির কিচির-মিচিরে চারপাশ মুখরিত। সন্ধ্যার পরিবেশটাই অন্য রকম, কেমন যেন উদাস ভাব এসে যায় । মনে পড়ে জীবনানন্দের সেই মহাগোধূলীর কথা-
         “সোনালী খড়ের ভারে অলস গরুর গাড়ি-বিকেলের রোদ পড়ে আসে।
          কালো নীল হলদে পাখিরা ডানা ঝাপটায় ক্ষেতের ভাড়ারে
          শাদা পথ ধূলো মাছি- ঘুম হয়ে মিশছে আকাশে
          অস্ত সূর্য গা এলিয়ে অড়ব ক্ষেতের পারে পারে
          শুয়ে থাকে; রক্তে তার এসেছে ঘুমের স্বাদ এখন নির্জনে।”
সন্ধ্যার এই নির্মল পরিবেশে এ কী দৃশ্য! দু’জন লোককে মনে হল শ্যামল চাচাদের বাড়ির দিকে দৃষ্টি রাখছে। লোক দুটিকে এ এলাকায় কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না। আর এদের হাব ভাবও ভাল ঠেকছে না, কেমন যেন ষন্ডামার্কা চেহারা।
লোক দুটো আমাদের দেখতে পেল বলে মনে হলো। এমন ভাব করল যেন তারা এই পথ দিয়েই যাচ্ছিল, ভুলে ওদিকে একটু দৃষ্টি পড়েছে আর কি! আমরাও এমন ভাব করলাম যেন কিছুই হয়নি। লোক দুটোর যে কোন বদ মতলব আছে সেটা আন্দাজ করতে পারলাম। আমি অনিককে বললাম,“ আয় তো অনেক দিন মুহিদ ভাইয়ের সাথে কথা হয় না, একটু দেখা করে যাই।” মুহিদ ভাই হল শ্যামল চাচার ছেলে। এলাকার ভিতর তারা খুব অবস্থাপন্ন।
শ্যামল চাচা বাড়ির বারান্দায় চেয়ার পেতে বেেসছিলেন। আমাদের দেখে বললেন,“বাবারা কেমন আছ? এই সন্ধ্যাকালে আগমন যে?”
আমি বললাম,“এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই ভাবলাম মুহিদ ভাইয়ের সাথে একবার দেখা করে যাই।”
“যাও, মুহিদ ঘরের ভিতরেই আছে। আমি যাই মাগরিবের নামাজটা পড়ি গিয়া।”
আমাদের আর ভেতরে যেতে হল না। মুহিদ ভাই নিজেই আসলেন। মুহিদ ভাইয়ের চেহারা কুশ্রী হলেও, দশজনে একখানা। আমায় দেখে খুব খুশি হলেন বলে মনে হলো। আমার হাত ধরে টেনে তার রুমে নিয়ে গেলেন। বললেন, “একদম ঠিক সময়ে এসেছিস, শিশির। আমি মনে মনে তোর কথাই ভাবছিলাম।”
“হঠাৎ এই অধমের কথা মনে পড়ল যে?” ভাব দেখানোর জন্য মাঝে মাঝে আমি এই কথাটা বলে থাকি।
“আর বলিস না, একটা চিঠি লিখার দরকার ছিল। আর তুই তো জানিস আমার হ্যান্ড রাইটিংয়ের অবস্থা। তোর লেখার একটু শ্রী আছে কিনা, তাই বলছিলাম চিঠিটা লিখে দিতি যদি?”
“কিন্তু মুহিদ ভাই, আমি তো এখন পারবো না। বাড়ি যেতে হবে শীঘ্ঘির।”
“সামান্য একটা কাজ করে দিতে পারবি না।”
“কার কাছে লিখবে?”
মুহিদ ভাই আহলাদে গদগদ হয়ে বললেন, “সে তো তোদের বলা যাবে না।”
অনিক আগ বাড়িয়ে বলল, “নিশ্চয় সার্জিল আপুর কাছে।”
মুহিদ ভাই লজ্জা পেয়ে বললেন, “ তোরা তো দেখি বেশি বুঝিস। লিখে দিবি কিনা বল?”
হাতের লেখা সুন্দর হলেও যে মাঝে মাঝে ঝামেলা পোহাতে হয় সে আমি মুহিদ ভাইয়ের কারণে ভাল জানি। সার্জিল আপুকে লেখা ওনার সবগুলো প্রেমপত্র আমার হাতেই লেখা। কাশু খানের বউ প্রিনকির ভাবীর সাথে ওনার পরকীয়া প্রেম ছিল। পরকীয়া প্রেমটা আমি মানতে পারি না, তাছাড়া এটা দেশ ও দশের জন্য ক্ষতিকর। আর তাই অনেক চেষ্টায় এটা বন্ধ করতে পেরেছিলাম। ওনার বর্তমান প্রেম নিয়ে আমি কিছু বলতে পারি না তাহলে স্বয়ং মমতাজ শাহজাহানকে অবমাননা করা হয়।
আমি কথার মোড় ঘুরিয়ে বললাম, “মুহিদ ভাই, আপনাকে একটা জরুরি খবর দিতে আসলাম। চিঠি না হয় কাল লিখা যাবে। ব্যাপারটা হলো, দু’জন লোক আপনাদের বাড়ির দিকে নজর রাখছিল। আর ইদানিং চোর-ডাকাতের যা উৎপাত বেড়েছে বুঝেনই-তো। সাবধান হয়ে থাকবেন।”
“বলিস কি!” বলে মুহিদ ভাই আতকে উঠলেন।
তারপর আমাদের কিছু না বলেই হন হন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমরাও আর দেরি না করে বাড়ির দিকে রওনা হলাম।
আমাদের বাড়ির সীমানায় এসে দেখলাম বাড়ির বারান্দায় বেত হাতে নিয়ে আব্বু আমার অপেক্ষায় আছেন। রাম নাম নাকি আল্লাহ জপব তাই ভুলে গেলাম। এইবারের মতো রক্ষা পেলে বাঁচি!
কিন্তু আমারও কী বুদ্ধি কম ! যেমন বেগুন তেমন শুটকি না,না যেমন বাপ তেমন  ছেলে। আমার রুমে একটা জানালা ছিল যেটা আমি বিপদের সময় দরজা হিসেবে ব্যবহার করি। জানালার গ্রীলের এক পাট খুলে ব্যবস্থাটা করেছিলাম। কষ্ট হলেও মোটামুটি ঢুকা যায়। শুধু ঢুকলে তো হবে না, আরো কিছু করতে হবে। আমার আব্বু যা চালাক। ভাগ্য ভাল, মিশুটা আমার রুমে একবার ঢু মেরে গিয়েছিল। একে দিয়ে দুটো রসুন আনালাম। তারপর জ্বরের ভান করে পড়ে থাকা।
আব্বু তো প্রথমে বেত নিয়ে মারতে এলেন। তারপর জ্বরে আমার খারাপ অবস্থা দেখে গজরাতে গজরাতে থেমে গেলেন। আমার মনে হল একটু বেশিই অভিনয় করে ফেলেছি। তাছাড়া রসুনে পুরো শরীর গরম হলো না। তারপরও সেদিনের মতো রক্ষা পাওয়া গেছে। তবে একগাদা ওষুধ গিলতে হয়েছে ঠিকই। বাবাগুলো যে কেন এমন হয়, জানি না। সব সময়ে শাসনে রাখতে চায়। আমরা নিজেরা যে একটু চলতে শিখেছি তা বোঝতেই চায় না। মাসিক ‘ভূতের আলো’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘গো-রামের’ লেখা ছড়াটার কথা মনে পড়ে গেল। বেচারা কত অতিষ্ট হয়েই না ছড়াটা লিখেছিল!
গোরামের লেখা ছড়াটা তোমাদের খুব পড়তে ইচ্ছে করছে তাই না! আর তোমাদের জন্যই লিখে দিলাম-
                               “আমি যদি বাবার মত হতাম বড়
                                বাবা হত ছোট্ট খোকা
                                তবে বাবাকে বলতাম, বাবা তুমি পড়।
                                পড়া যদি নাইবা শেখা হত
                                কান ধরে টানতাম অবিরত।
                                বাবাকে নামতা অ, আ পড়তে দিয়ে
                                বসে বসে চা খেতাম আমি গিয়ে।
                                রোজ সকালে বাবকে পাঠাতাম স্কুলে
                                যদি নাইবা চাইত যেতে
                                বলতাম, একঘায়ে চামড়া নেব তুলে।
                                বিকেল বেলা বাব ধরত খেলার বায়না
                                বলতাম আমার সাথে বাজারে আয়না!
                                বাবার উপর বাজারের বোঝা ছাপিয়ে
                                রাগ করলে বলতাম, গেছি হাপিয়ে।
                                তাহলে বুঝত বাবা, রোজ আমার কত কষ্ট
                                এভাবেই জীবনটা মোদের হচ্ছে নষ্ট।”

No comments:

Post a Comment