Wednesday, September 14, 2011

চার

পরদিন স্কুলে একটু দেরি করেই গেলাম। ক্লাসেও প্রবেশ করালাম স্যার ঢুকার সাথে সাথে। ইচ্ছে করেই করেছিলাম। পাছে ঐ মেয়ে যদি রাস্তায় ধরে কিংবা ক্লাসে সবার সামনে চর মারে। ভেবেই শিহরিত হলাম। বলা তো যায় না মানুষের মন। কখন যে পরিবর্তন হয় স্বয়ং গণকও বলতে পারবেনা। তাছাড়া বইয়ে পড়েছি সকল মানুষের মন প্রতিশোধ পরায়ন। সুতরাং ও যে প্রতিশোধ নেবে না তার কী গ্যারিন্টি আছে(?!)
ক্লাসে বসেও কোন কোন দিকে তাকানোর চেষ্টা করলাম না । যদিও ঐ মেয়ের পেত্নি মূর্তির পরিবর্তন ঘটেছে কিনা তা দেখার ইচ্ছা করছিল। কিন্তু প্রতিশোধ পরায়ন  দুটি চোখ দেখতে পাব বলে সেদিকে তাকানোর আর দুঃসাহস করলাম না। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে এসেছি, এই মেয়ের আর দুই জনমেও ঝগড়া করব না। ও চাইলেও না,পারলে বন্ধুত্ব করে ফেলব।
নিশি গনিতে ভাল ছিল। কারো কোন অংক  করতে কিংবা বুঝতে হলে সে সব সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিতে পারত। তাই অংকের ব্যাপারে সবাই ওর দ্বারস্থ হতো । তাই ভাবলাম, অংকের ছুতো দিয়ে ওর সাথে কথা বলে আসি।অংকটা যদিও আমি পারতাম তারপরও ক্লাসে ফাঁকা আওয়াজ ছেড়ে বললাম,“ অনুশীলনী দশের ছয় নম্বর অংকটা  কারো করা থাকলে দিলে উপকার হতো।”
আমার কথার প্রতিত্ত্যুরে ও বলল,“এই অংকটা কেউই করেনি একমাত্র তোর খাতায় আছে।”
আমি কনফিডেন্ট নিয়েই বললাম,“কে বলল আমার খাতায় করা আছে?”
ও বেশ নমনীয় হয়েই বলল,“সে আর বলতে হয়না। সবাই জানে আজ অংক ক্লাস হবে না । দেরী করে আসায় তুই ঘোষনাটা শুনতে পাসনি।”
সত্যিই তো আমি জানতামই না যে আজ অংক ক্লাস হবে না। ওর কথায় সবার সামনে বেশ লজ্জাই পেলাম। তবে এই মেয়ের দৃষ্টিশক্তি দেখে অবাক হলাম। বিচক্ষণ বলা যায় । ভবিষতে ভাল গোয়েন্দগিরি করতে পারবে।
তবে যা ভেবেছিলাম তার কিছুই হয়নি দেখে খুশিই হলাম। ওর কারণে হলেও নিউটনের তৃতীয় সূত্র ব্যর্থ হয়েছে। ওর আমার প্রতি কোন আক্রোশ তো নেই-ই উল্টো দু’জনে ভাল বন্ধু হয়ে হয়ে গেলাম। টিফিন পিরিয়ডের আগে নিঃশঙ্কোচে ওর সাথে মিশে গেলাম। যদিও প্রথমে তুই-তুমি নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল কিন্তু ওর দেখা দেখি নিজেও তুই করে বলে ফেললাম। ওর সাথে বন্ধুত্ব করার আগে মেয়েদের সাথে যে, বন্ধুত্ব করা যায় সে বিষয়ে ধারণাই ছিল না। আর যারা করত তাদের আতেঁল বলেই মনে হতো।
টিফিন পিরিয়ডের পরে বিখ্যাত বিষু স্যারের গনিত ক্লাস হয়। কিন্তু আজ গনিত ক্লাশ হবে না আমার মতো ভাবুক কবির অজানা থাকলেও সবার জানা ছিল। গনিত ক্লাসে এলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় হেডস্যার। ওনার মত মানুষ পাওয়া আসলে দুষ্কর। একেবারে মাটির মানুষ। দীর্ঘ তিরিশ বছর ধনে ওনি সম্মানের সাথে একেই স্কুলে শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। স্যার ক্লাসে প্রবেশ করার পর অনিক আমায় খোঁচা দিয়ে বলল, “জানিস নিশি আমাদের হেডস্যারের নাতনী”। কথাটা শুনে কেমন যেন আতঁকে উঠলাম । স্যার যদি জানতেন তার নাতনীর গায়ে হাত তুলেছি তাহলে অবস্থাটা কী হতো (!?) নির্ঘাত টিসি হয়ে যেত। মনে মনে ভাবলাম, এমন ভাল মানুষেরই এমন ভাল নাতনী হয়।
হেডস্যার ক্লাসে এসেছেন আমদের বার্ষিক-ক্রিয়া প্রতিযোগিতা নিয়ে কথা বলতে। স্যার বললেন, “শিক্ষকদের অনুরোধে এবার বার্ষিক ক্রিয়া প্রতিযোগিতায় একটা নতুন ইভেন্ট যোগ হবে। এতে অংশগ্রহন করবে ছাত্র শিক্ষক সবাই। ছাত্র শিক্ষদের ভিতর প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। স্কুলে সিনিয়র হিসেবে তোমাদের ক্লাস থেকেই দল বাছাই করা হবে।” উল্লাসে সবাই হাত তালি দিতে লাগলাম।
স্যার আরো বললের,“তোমাদের ভিতর থেকে একজন দাঁড়াও যে দলের ভাল ক্যাপ্টিনসি করতে পারবে।”
সবাই জানে আমি ভাল ক্রিকেট খেলি, তাই ক্যাপ্টিন হলে আমাকেই হতে হবে। তাছাড়া এলাকার ক্রিকেট দলের নেতৃত্ব তো আমিই দেই। তাই সগর্বে দাড়িয়ে গেলাম। কিন্তু আমার সাথে আর একজন দাঁড়ালো, ইভটেজার রকি। যে কিনা ইভটিজিংয়ের জন্য পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছিল। “আমি একজন ইভটেজার” লেখা সাইন বোর্ড ওর গলায় ঝুলিয়ে পুরো এলাকা ঘুরানো হয়েছিল। তারপরও দমে যায়নি বেচারা, নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে স্বগর্বে। 
স্যার একটু ভেবে বললেন, “এক দলে তো দুই ক্যাপ্টিন  হতে পারে না । তাই তোমরা (সকল ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে)  যে যাকে সাপোর্ট কর তার পাশে গিয়ে দাঁড়াও। ”
হায় অল্লাহ! আমার ভাগ্যে যে এই হাদারামগুলি পড়বে তা জানলে কখনই ক্যাপ্টিন হবার দুঃসাহস দেখাতাম না। আধাপাগল অনিক, আতেল জনি,  চিকা ইরফান, বোবা শামসু, ক্ষুদে বালক সিদ্দিক----- এরা নাকি আমার  দলের খেলোয়ার ! আর আমি যে মেয়েদের ভিতর এক জনপ্রিয় আজ তা জানতে পারলাম। তাছাড়া মেয়েরা ইভটেজারকে সাপোর্ট করবেই বা কেন? ছেলেদের সাথে মেয়েরাও তাদের ক্যাপ্টিন বাছাই করে নিল। এ ব্যাপারে মেয়েদের উৎসাহ দেখে স্যার বললেন,“আরে! তোমরাও খেলবে নাকি?” এ কথা শুনে ছেলেরা সব হাসতে লাগল। 
কিন্তু আমাদের হাসিকে তুচ্ছ করে নিশি বলল,“জ্বি স্যার আমরাও খেলব।”
স্যার ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে বললেন,“ঠিক আছে, তোমাদের দু’ দলের ভেতর অন্তত তিনজন মেয়ে রাখবে। আর দু দলের  ভিতর যে চ্যাম্পিয়ন হবে সে দল খেলবে টিচারদের সাথে ফাইনাল ম্যাচ।” এ ঘোষণায় ছেলেরা কেমন যেন বিমর্ষ হলো। মেয়েদের সাথে খেলতে হবে বলে কেউ কেউ উৎসাহই হারিয়ে ফেলল। ধর্মভীরু নাহিদ ‘নাউযুবিল্লাহ’ বলে বুকে থুুতু থুতু দিয়ে বসে পড়ল।
ছুটির পর সবাইকে বটতলায় অপেক্ষা করতে বললাম, দল বাছাই করব তাই। স্কুলের টিউবওয়েলে পানি খেতে গিয়ে দেখা হল ফয়সালের সাথে। মাথায় আবার ব্যান্ডেসও করা। ও সব সময় আমার গুনগ্রাহী হয়েও কেন ইভটেজার রকির দলে গেল ব্যাপারটা  বুঝলাম না।
ওকে বললাম,“কিরে তুই মেয়ে পাগল রকির দলে গেলি যে!”
ও কেমন যে অবাক হয়ে বলল,“সত্যিই কী আমি রকির দলে গিয়েছি?”
“বেশি ঢং করবি না, মনে হয় কিছুই জানিস না ! ঐ  ইভটেজারটা তোকে কত টাকা দিয়েছে?”
“ আসলে কাল রাতের ঘটনার পর মাথাটা কেমন যেন গোল বেধে আছে! কী করি কিছুই বুঝতে পারি না!”
“কাল রাতে কী হয়েছিল?”
“ও তোকে তো বলাই হয়নি, আমাদের বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল। আমার সখের ব্যাটটাও ভেঙ্গে ফেলেছে। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে যাহোক কিনেছিলাম।”
“ ব্যাট ভাংলো কেমন করে?”
“কী বলব দু:খের কথা, আমার মাথায় বাড়ি দিয়েই ব্যাটটা ভাংলো। ঘরে টাকা পয়সা যা ছিল সব নিয়ে গেছেরে। আমরা ফকির হয়ে গেছিরে, শিশির।”
“থাক থাক, আর দুঃখ করিসনে। যা হবার তো হয়ে গেছে। কিপটের ধন কী আর বেশী দিন থাকে রে?” বলে চলে আসলাম। ফয়সালের বাবা যা কিপটে, আল্লাহ হয়ত ফেরেস্তা পাঠিয়েছে কিপটের ধন নিতে।
বট বৃক্ষের নিচে সবাইকে বেশ আগ্রহ নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করতে দেখলাম। মেয়েদের ভেতরও উৎসাহের কমতি নেই। ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে সর্বমোট তেরজনের একটা দল তৈরী করলাম। আজ থেকেই প্রাকটিস শুরু করব বলে বিকেলে সবাইকে মাঠে আসতে বললাম। বিকেল বেলা মেয়েদের খেলা দেখে মনে হলো, ক্রিকেট একটা তামাসার খেলা। আসলে যার কাজ যা নয় তাকে দিয়ে তা করানোই মুশকিল। মেয়েদের দিয়ে কখনো ক্রিকেট হবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। যদিও ইদানিং মেয়েদের ক্রিকেট দলই বেরিয়েছে। নিজেদের ভেতর খেলে ভাল করলেও ছেলেদের অনুর্ধ-১৭ এর সাথে খেলে তো চব্বিশ রানেই অলআউট হয়।
আমাদের দলে যে মেয়ে গুলো আছে তো খেলা পারবে না, উল্টো আমাদের খেলা ভুলিয়ে ছাড়ছে। এদের বাদ ও দিতে পারছিনা তাহলে হয়তো আমাদের টিমই বাতিল হয়ে যাবে। ভালই ফ্যাসাদে পড়া গেল।  অগত্যা বিপদে পড়েই রাত দিন খেটে এদের খেলা শেখাতে হচ্ছে।  তবে ওদের ভিতর উৎসাহ থাকাতে ব্যাপারটা কিছুটা হলেও সোজা হল।
আর একদিন পরেই রকিদের টিমের সাথে আমাদের খেলা। স্যারদের সাথে ফাইনাল খেলতে হলে ওদের সাথে আমাদের জিততেই হবে। ওদের টিম আমাদের থেকে শক্তিশালী । আদনান, জোবায়ের , হামিদ, মিরাজ আর আতিকের মতো ঘাঘু খেলোয়ার ঐ টিমে আছে। আর আমার টিমে আছে যওসব জ্ঞানী-গুনীর দল। অনিককে শট শেখাতে গেলে ও বলবে, “বিজ্ঞানের সূত্রকে যদি আমরা কাজে লাগাই তাহলে আমরা খুব সহজে জিততে পারি। এ ক্ষেত্রে প্রাসের সূত্র সর্বোত্তম। আমরা যদি বলকে ৪৫কোণে মারি তাহলে সেটা ছক্কা হতে বাধ্য। অভিকর্ষ বলকে কাটাতে হলে বলকে অনেক দ্রুত কাজ করতে হবে।”
তখন আমি বললাম, “হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছিস। মাঠে নামার সময় চাঁদা আর পেন্সিল কম্পাস নিয়ে যাস। তারপর বলারকে বলবি, ভাই একটু দাঁড়ান হিসাব করে নেই।”
ও তখন আহলাদে গদগদ হয়ে বলল, “বাহ্ তোর বুদ্ধিটা তো খারাপ নয়।”
আরেকজন আছে কবি মজনু। কারো কিছু দেখলেই গলা উচিয়ে স্বরচিত নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করে-
                            “ হে তরুণ, জাগিয়াছ পৃথিবীর বুকে
                              তুলিয়াছ ধার
                              কেন মানিবে হার
                              কার আছে হিম্মত, তোমায় আজি রুখে।
                              আজিকার বায়ু
                              বাড়ায়েছে আয়ু
                              বিজয় রবি দেখিতেছি তব মুখে।”

No comments:

Post a Comment