মাঠের সীমানা বিশাল। লোকে একে ‘পাগল-খাইয়া’ নামে ডাকে। কিন্তু কেন ডাকে তা আমার জানা নেই। হয়ত এ মাঠ ধরে ধরে পাগল খেত, তাই এমন হতে পারে। মাঠের ও পাশটা জঙ্গলে ভরা। তবে জায়গাটা চমৎকার। গান ধরার ইচ্ছে জাগে। আমি গান গাইলে আশেপাশে হুলস্থূল কিছু ঘটে যায় ভেবে ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখলাম। মজনুটা দেখি ঠিকই ধেঁড়ে গলায় গান ধরেছে। ‘এমন ক্ষণে আইসো বন্ধু, কইব কথা তোমার সনে।’ আশেপাশে কুকুর নেই তাই রক্ষা। তারপরও কী উপায় আছে! একদল বানর ভয় পেয়ে বটফল দিয়ে মজনুকে টার্গেট করে ছুড়ে মারল। একটা তো ওর ঘাড়ে বসে দুটো ছাটিই মেরে গেল। মজনু হর হর করে দৌড়ে কোন রকমে বাঁচল। বটফলের টার্গেট আমাদেরও মিস করল না। ভাগ্যিস আমি গান ধরিনি, তাহলে নির্ঘাত আরো ভয়াবহ কিছু ঘটে যেতে পারত।
বটফলের আঘাতে মজনুর কপালের এক পাশ ফুলে গেছে। নতুন শিং গজানোর সময় গরুর যেমনটা হয়। তাই দেখে অমল বলল, “তুই তো গেছসরে মজনু। কয়েকদিন পর শিং গজাবে, তারপর লেজ।”
সিদ্দিক যোগ করে বলল, “ঘাস খাবি আর হাম্বা হাম্বা করে গো সঙ্গীত গাইবি।”
এর ভিতরে মজনুটা আবার কান্নাকাটি শুরু করে দিল। একে নিয়ে তো ভালই ঝামেলায় পড়া গেল। বন্ধুদের তামাশায় কেউ এমন বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদে! আমি একে স্বান্তনা দিয়ে বললাম, “বন্ধুরা তো তামাশা করতেই পারে। তাই বলে কাঁদতে হয় মজনু? ছিঃ ছিঃ মজনু। কাঁদিস না তোর লেজ, শিং কিচ্ছু গজাবে না। তোর ঘাসও খেতে হবে না।”
মজনু মুখটা আলু কাবলির মতো করে বলল, “আমি এ জন্য কাঁদছি নাকি! পায়ে একটা কাচ বিধল তাই।” বেচারা মজনু আবার চেঁচিয়ে উঠল।
নিচে তাকিয়ে দেখলাম আশেপাশে বিস্তর ভাঙ্গা বোতলের টুকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা বোতল নিয়ে গন্ধ শুকে বুঝলাম, এ আর কিছু নয় পেনসিডিলের বোতল। উপরে লেভেলও লাগানো আছে। ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল না, আশে-পাশে বাড়ি-ঘর কিছু নেই, নীরব-নিস্তব্ধ পরিবেশে কারাই বা পেনসিডিল খেয়ে মাতাল হয়। পুরো জিনিসটা রহস্যময় হয়ে উঠেছে। জায়গাটা ভাল করে সার্চ না করে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না।
ঝোপ-জঙ্গলে ভরা এ বনের ভিতর চারজন রহস্য উদঘাটনে নেমে পড়লাম। এখানে কাটা গাছের সংখ্যা বেশি। কয়েকটায় লেগে হাত ছিলে গেল। একটা গাছে দেখলাম থোকায় থোকায় ফল ঝুলে আছে। ফলগুলো দেখে জিবে জল এসে গেল। লোভ সামলাতে না পেরে কয়েকটা ছিড়ে নিলাম। মুখে পুরেই ভড়কে গেলাম, এত সুন্দর ফলের এত বিশ্রি স্বাদ হয়!
অমল হাসতে হাসতে বলল, “তুই পাগল হয়ে যাবি! নির্ঘাত পাগল হবি! এটা ডুমুর ফল। ডুমুর ফল খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়।”
আমি বেশ গলা উচিয়ে বললাম, “পাগল হওয়া তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। এই জগতে পাগল কয়টা আর ভাল মানুষ কয়টা আছে বলত? নিশ্চয় পাগলের সংখ্যা কম। পাগল হতে কপাল লাগে বুঝলি। পাগলের মত চিন্তা-ভাবনাহীন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।”
আরো কতগুলো ডুমুর ফল এগিয়ে দিয়ে অমল বলল, “তাহলে এই নে বেশি করে ডুমুর খা। যদি তোর সৌভাগ্য লাভ হয়।”
সৌভাগ্য লাভের প্রত্যাশায় এই বিশ্রি স্বাদের ফলটা আর মুখে তোলার সাহস হলো না।
এরি মধ্যে সিদ্দিকটা কোথায় যেন অদৃশ্য হল! “সিদ্দিক, খুদে মানব সিদ্দিক” বলে বার বার ফাঁকা আওয়াজ দেওয়ার পরও কোন সাড়া এলো না। তিনজনে মিলে ঝোপঝাড়ে অনেক খোঁজ করলাম। কিন্তু সিদ্দিকের কোন হদিশ মিলল না। তাহলে সিদ্দিক গেল কোথায়? অদৃশ্য হয়ে গেল না তো! কিন্তু ও তো জাদু জানে না।
ক্ষুদ্র মানব সিদ্দিককে খোঁজার ফাঁকে ঝোপের ভিতর একটা কলার ছড়ি আবিষ্কার করল অমল। এখনো পাকেনি তাই উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম। কিন্তু মজনুর আর তর সইল না। কাচা কলা পাড়ার জন্য ঝাপিয়ে পড়ল ঝোপের মধ্যে। সাথে সাথে মজনুও অদৃশ্য! ধুপধাপ করে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনলাম শুধু। বার বার ডেকেও কোন সাড়া পাওয়া গেল না।
আমি আর অমল কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে রইলাম। আমার বিবেক নাড়া দিয়ে উঠল। আমাদের দুই দুইজন বন্ধু অদৃশ্য হয়ে গেছে, আর আমারা দাড়িয়ে আছি! নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম। অমলকে বললাম, “যা থাকে কপালে। ওদের না নিয়ে কাপুরুষের মতো ফিরে যাব না। ফিরলে চারজন, না হলে কেউ না। ছাগলের মতো বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু ঢেড় ভাল।”
“ঠিক বলেছিস।”
দু’জনে প্রচন্ড ভয় কিন্তু দুঃসাহসিকতা নিয়ে এগিয়ে গেলাম। আশপাশ থেকে এখানে ঝোপঝাড়ের পরিমানটা একটু বেশি। ভেবেছিলাম আশ্চর্যজনক কিছুর দেখা পাব কিন্তু দেখলাম ঝোপঝাড়ের নিচ দিয়ে সুরঙ্গের মত একটা পথ নিচে নেমে গেছে। অমল আমার দিকে চেয়ে বলল, “নামবি?”
আমি খুব প্রত্যয় নিয়ে বললাম, “নামব না তো কী? আমাদের দু’বন্ধু বিপদে পড়ে আছে, সো ঝটপট ঝাপিয়ে পড়।”
ঢালু ভেবে দু’জনে ঝটপট নামার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এটা মোটেও ঢালু নয়। একটু ঢালু হয়ে খাদের মত বিশাল গর্ত। উপর থেকে সোজা নিচে পড়ে ভালই ব্যথা পেলাম। অমলটা আবার ঘাড়ের উপর ধপ করে পড়ল। আরো ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম।
গর্ত না সুরঙ্গ এখনো বুঝতে পারছি না। ভেতরে মোটামুটি অন্ধকার। চারপাশে কিছুই দেখা যায় না। তবে কিছুক্ষণের ভেতর অন্ধকারটা চোখ সয়ে এলো। মজনুটাকে গর্তের ভেতর অজ্ঞান অবস্থায় পেলাম। আশেপাশে কোন পানি নেই তাই থুথু ছিটিয়ে একে সজাগ করতে হল। বেচারা সজাগ হয়ে হাউ মাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। পরে আমাদের চিনতে পেরে কান্নাকাটি বন্ধ করে আমায় দোষারোপ করে বলল, “তোর জন্য আজ এই অবস্থা! গোয়েন্দাগিরি নাকি উজবুকের কান্ডকীর্তি, ঘোড়ার ডিম খোজা।”
“চুপ কর, আমাদের রহস্যের সমাধান এখানেই পেয়ে যেতে পারি।”
“রহস্য না ছাই! এখান থেকে বের হতে পারলে বাঁচি।”
অমল খোঁচা দিয়ে বলল, “বের হতে পারবি না। এই গর্ত বেয়ে উপরে উঠা অসম্ভব। বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।”
আমি বললাম,“আমিও তাই ভাবছি। আর এটা কোন গর্ত নয়, সুড়ঙ্গ। আশে-পাশে কোথাও জমিদার বাড়ি আছে বলে মনে হয়। চল সামনে যাওয়া যাক্।”
মজনু গো ধরল, “আমি যাব না।”
তাহলে তুই এখানেই থাক, বলে আমরা দু’জন সামনে এগোতে লাগলাম। পরে ঠিকই পিছু পিছু আসল। সুড়ঙ্গটা অনেক পুরনো দিনের মনে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সুরঙ্গের প্রাচীর ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ে আছে। ক্রমে পুরনো দিনের ইতিহাসে ঢুকে পড়ছি বলে মনে হল। ক্রমশ অন্ধকার হাতড়ে কোন রকমে পথ চলছি। আমাদের ভিতর একজন সিগারেটখোর থাকলে মন্দ হতো না! তাহলে অন্তত একটা লাইটার পাওয়া যেত। যদিও মজনু কবিতার প্রয়োজনে মাঝে মাঝে দু-একটা টান মেরে থাকে তবে চেইন স্মোকার নয়। ভাব আনার জন্য ও এ কাজটা করে থাকে।
বাতাসে কেমন যেন একটা কটু গন্ধ টের পেলাম। ইঁদুর আর চিকাগুলো আমাদের সাড়া পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ব্যাপারটা ঐতিহাসিক থেকে ভূতোরে দিকে যেতে লাগল। এক ঝাক চামচিকার উড়োউড়িতে পরিবেশটা আরো ঘোরতর হয়ে উঠল। অমলটা আবার চামচিকাদের পিছু পিছু দৌড় দিল। দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, “চামচিকাদের পিছু পিছু গেলে পথ একটা পাওয়া যাবেই। তাড়াতাড়ি দৌড়া। চামচিকারা পথ চেনে।”
আমি বললাম, “চামচিকারা যে পথ চেনে সে পথে তুই যেতে পারবি বলে মনে হয় না। যদি না চামচিকা হস।”
সত্যিই তাই হল। চামচিকা গুলো সুরঙ্গের উপরের সরু ছিদ্র দিয়ে ঠিকই বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে পথে মানুষের যাওয়া অসম্ভব। মজনু আর অমল দুটোকে হতাশ মনে হল।
সিদ্দিককে নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তা হলো। বেচারা যে কোন বিপদে পড়েছে! অবশ্য আমরাও কী কম বিপদে আছি ? যতদূর ভাবছি সব জঘন্য লাগছে। কেন যেন মনে হচ্ছে আমাদের মতো সিদ্দিকও সুড়ঙ্গ বন্দী। এখান থেকে উদ্ধার পাওয়াই এখন আসল কাজ।
মজনু বলল, “কবরে এর থেকেও বেশি অন্ধকার হবে নাকি রে?”
“আমি মরে কবরে গিয়েছি যে জানব কবরে কেমন অন্ধকার!” খুব রাগ নিয়েই উত্তরটা দিলাম।
অমল বলল, “নিশ্চয় এ সুরঙ্গে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে।”
“আমিও তাই ভাবছি। একবার ভেবে দেখ তো, ডাকাতগুলো সবার চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে যায়, এটা কীভাবে সম্ভব? এতগুলো মানুষের চোখকে ফাঁকি দেয়া সোজা ব্যাপার না!”
মজনু ফ্যাকাশে গলায় বলল, “সব ভেলকি বাজি। নিশ্চয় জাদু জানে। এই জাদুতে আমরাও আটকে গেছি।”
“না মোটেও তা নয়। পুরো ব্যাপারটার সাথে সুরঙ্গ জড়িয়ে আছে। দেখি কতদূর সত্য হয়।”
অমল ভয় পাওয়া কন্ঠে বলল, “তুই কী গরুর ডাকের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিস?”
মজনু তামাশা করে বলল, “তোর বোধ হয় গরু রোগ হয়েছে তাই গরুর আওয়াজ শুনতে পাস।”
কিন্তু একটু পরে আমি শুনলাম ছাগলের আওয়াজ। মজনু শুনল ভেড়ার ডাক। আশেপাশে কোথাও গরুর হাট আছে নাকি! সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে গরু বাজারে ঢুকে পড়ছি কিনা সন্দেহ হল। গরু ছাগলের আওয়াজ ক্রমেই স্পষ্ট হতে লাগল। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মানুষের কণ্ঠও শুনতে পেলাম। ভয় আর উৎকণ্ঠায় সামনে এগিয়ে চললাম।
অমল আর মজনুকে সাবধান করে দিয়ে বললাম, “বিড়াল হয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর। একটা শব্দও যাতে না হয়। দরকার হলে জুতো খুলে ফেল। কাশি আসুক আর পিঁপড়ে কামড়াক না কেন, কোন শব্দ করা যাবে না। ধরা পড়লে জান নিয়ে ফিরতে পারবি না!”
মজনুটা এমন সিরিয়াস কথার ভিতরেও বলল, “জান-প্রাণ দরকার নেই এই হাত নিয়ে ফিরতে পারলে হয়। তাহলে অন্তত কবিতা লিখে জীবনটা পার করতে পারব।”
মজনুর এই আবেগী কথা শুনে মনটা পুরো পানিভাত হয়ে গেল। কিন্তু কাজের সময় অনুভূতির কোন দাম নেই তাই ব্যাপারটা মুহূর্তে ঝেড়ে ফেললাম।
অমলটা আবার দলনেতার ভান করে বলল, “বন্ধুরা যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এই পথে পা বাড়িয়েছি তা ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও.............”
কথাটা শেষ করতে দিলাম না। মাথায় দুটো চাটি মেরে বললাম, “তোরা রক্ত দিলে দে আমি পারব না। রক্ত দিলেও কাজ হবে না। সে রক্ত বৃথা যাবে। যা করার বুদ্ধি দিয়ে করতে হবে।”
আমার কথা শুনে অমলের ভাব পুরো মাটি হয়ে গেল।
ছাগল আর গরুর আওয়াজ ধরে সামনে এগোতে লাগলাম। যেতে যেতে সামনে পড়ল ত্রিমুখী সুরঙ্গ, তিন দিকে তিন মুখ গিয়েছে। কোন দিকে যাব দ্বিধা-দ্বন্দে পড়ে গেলাম।
অমল বলল, “তিন জন তিন দিকে গেলে কেমন হয়?”
মজনু বলল, “না, ভাই আমি একা যেতে পারব না। কোথায় কোন বিপদে পড়ি কে জানে।”
আমি বললাম, “তিনজন আলাদা না হওয়াই ভাল। একজনকে হারিয়েছি আর কাউকে হারানো যাবে না। নাক বরাবর রাস্তা দিয়ে চল। আর গরু ছাগলের হাট সামনেই মনে হচ্ছে।”
নাক বরাবর সোজা নিঃশব্দে হেঁটে গেলাম। কিন্তু সামনে গিয়ে যা দেখলাম তাতে অবাক, বিস্ময়, হতবাক হয়ে গেলাম!
বটফলের আঘাতে মজনুর কপালের এক পাশ ফুলে গেছে। নতুন শিং গজানোর সময় গরুর যেমনটা হয়। তাই দেখে অমল বলল, “তুই তো গেছসরে মজনু। কয়েকদিন পর শিং গজাবে, তারপর লেজ।”
সিদ্দিক যোগ করে বলল, “ঘাস খাবি আর হাম্বা হাম্বা করে গো সঙ্গীত গাইবি।”
এর ভিতরে মজনুটা আবার কান্নাকাটি শুরু করে দিল। একে নিয়ে তো ভালই ঝামেলায় পড়া গেল। বন্ধুদের তামাশায় কেউ এমন বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদে! আমি একে স্বান্তনা দিয়ে বললাম, “বন্ধুরা তো তামাশা করতেই পারে। তাই বলে কাঁদতে হয় মজনু? ছিঃ ছিঃ মজনু। কাঁদিস না তোর লেজ, শিং কিচ্ছু গজাবে না। তোর ঘাসও খেতে হবে না।”
মজনু মুখটা আলু কাবলির মতো করে বলল, “আমি এ জন্য কাঁদছি নাকি! পায়ে একটা কাচ বিধল তাই।” বেচারা মজনু আবার চেঁচিয়ে উঠল।
নিচে তাকিয়ে দেখলাম আশেপাশে বিস্তর ভাঙ্গা বোতলের টুকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা বোতল নিয়ে গন্ধ শুকে বুঝলাম, এ আর কিছু নয় পেনসিডিলের বোতল। উপরে লেভেলও লাগানো আছে। ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল না, আশে-পাশে বাড়ি-ঘর কিছু নেই, নীরব-নিস্তব্ধ পরিবেশে কারাই বা পেনসিডিল খেয়ে মাতাল হয়। পুরো জিনিসটা রহস্যময় হয়ে উঠেছে। জায়গাটা ভাল করে সার্চ না করে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না।
ঝোপ-জঙ্গলে ভরা এ বনের ভিতর চারজন রহস্য উদঘাটনে নেমে পড়লাম। এখানে কাটা গাছের সংখ্যা বেশি। কয়েকটায় লেগে হাত ছিলে গেল। একটা গাছে দেখলাম থোকায় থোকায় ফল ঝুলে আছে। ফলগুলো দেখে জিবে জল এসে গেল। লোভ সামলাতে না পেরে কয়েকটা ছিড়ে নিলাম। মুখে পুরেই ভড়কে গেলাম, এত সুন্দর ফলের এত বিশ্রি স্বাদ হয়!
অমল হাসতে হাসতে বলল, “তুই পাগল হয়ে যাবি! নির্ঘাত পাগল হবি! এটা ডুমুর ফল। ডুমুর ফল খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়।”
আমি বেশ গলা উচিয়ে বললাম, “পাগল হওয়া তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। এই জগতে পাগল কয়টা আর ভাল মানুষ কয়টা আছে বলত? নিশ্চয় পাগলের সংখ্যা কম। পাগল হতে কপাল লাগে বুঝলি। পাগলের মত চিন্তা-ভাবনাহীন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।”
আরো কতগুলো ডুমুর ফল এগিয়ে দিয়ে অমল বলল, “তাহলে এই নে বেশি করে ডুমুর খা। যদি তোর সৌভাগ্য লাভ হয়।”
সৌভাগ্য লাভের প্রত্যাশায় এই বিশ্রি স্বাদের ফলটা আর মুখে তোলার সাহস হলো না।
এরি মধ্যে সিদ্দিকটা কোথায় যেন অদৃশ্য হল! “সিদ্দিক, খুদে মানব সিদ্দিক” বলে বার বার ফাঁকা আওয়াজ দেওয়ার পরও কোন সাড়া এলো না। তিনজনে মিলে ঝোপঝাড়ে অনেক খোঁজ করলাম। কিন্তু সিদ্দিকের কোন হদিশ মিলল না। তাহলে সিদ্দিক গেল কোথায়? অদৃশ্য হয়ে গেল না তো! কিন্তু ও তো জাদু জানে না।
ক্ষুদ্র মানব সিদ্দিককে খোঁজার ফাঁকে ঝোপের ভিতর একটা কলার ছড়ি আবিষ্কার করল অমল। এখনো পাকেনি তাই উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম। কিন্তু মজনুর আর তর সইল না। কাচা কলা পাড়ার জন্য ঝাপিয়ে পড়ল ঝোপের মধ্যে। সাথে সাথে মজনুও অদৃশ্য! ধুপধাপ করে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনলাম শুধু। বার বার ডেকেও কোন সাড়া পাওয়া গেল না।
আমি আর অমল কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে রইলাম। আমার বিবেক নাড়া দিয়ে উঠল। আমাদের দুই দুইজন বন্ধু অদৃশ্য হয়ে গেছে, আর আমারা দাড়িয়ে আছি! নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম। অমলকে বললাম, “যা থাকে কপালে। ওদের না নিয়ে কাপুরুষের মতো ফিরে যাব না। ফিরলে চারজন, না হলে কেউ না। ছাগলের মতো বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু ঢেড় ভাল।”
“ঠিক বলেছিস।”
দু’জনে প্রচন্ড ভয় কিন্তু দুঃসাহসিকতা নিয়ে এগিয়ে গেলাম। আশপাশ থেকে এখানে ঝোপঝাড়ের পরিমানটা একটু বেশি। ভেবেছিলাম আশ্চর্যজনক কিছুর দেখা পাব কিন্তু দেখলাম ঝোপঝাড়ের নিচ দিয়ে সুরঙ্গের মত একটা পথ নিচে নেমে গেছে। অমল আমার দিকে চেয়ে বলল, “নামবি?”
আমি খুব প্রত্যয় নিয়ে বললাম, “নামব না তো কী? আমাদের দু’বন্ধু বিপদে পড়ে আছে, সো ঝটপট ঝাপিয়ে পড়।”
ঢালু ভেবে দু’জনে ঝটপট নামার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এটা মোটেও ঢালু নয়। একটু ঢালু হয়ে খাদের মত বিশাল গর্ত। উপর থেকে সোজা নিচে পড়ে ভালই ব্যথা পেলাম। অমলটা আবার ঘাড়ের উপর ধপ করে পড়ল। আরো ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম।
গর্ত না সুরঙ্গ এখনো বুঝতে পারছি না। ভেতরে মোটামুটি অন্ধকার। চারপাশে কিছুই দেখা যায় না। তবে কিছুক্ষণের ভেতর অন্ধকারটা চোখ সয়ে এলো। মজনুটাকে গর্তের ভেতর অজ্ঞান অবস্থায় পেলাম। আশেপাশে কোন পানি নেই তাই থুথু ছিটিয়ে একে সজাগ করতে হল। বেচারা সজাগ হয়ে হাউ মাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। পরে আমাদের চিনতে পেরে কান্নাকাটি বন্ধ করে আমায় দোষারোপ করে বলল, “তোর জন্য আজ এই অবস্থা! গোয়েন্দাগিরি নাকি উজবুকের কান্ডকীর্তি, ঘোড়ার ডিম খোজা।”
“চুপ কর, আমাদের রহস্যের সমাধান এখানেই পেয়ে যেতে পারি।”
“রহস্য না ছাই! এখান থেকে বের হতে পারলে বাঁচি।”
অমল খোঁচা দিয়ে বলল, “বের হতে পারবি না। এই গর্ত বেয়ে উপরে উঠা অসম্ভব। বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।”
আমি বললাম,“আমিও তাই ভাবছি। আর এটা কোন গর্ত নয়, সুড়ঙ্গ। আশে-পাশে কোথাও জমিদার বাড়ি আছে বলে মনে হয়। চল সামনে যাওয়া যাক্।”
মজনু গো ধরল, “আমি যাব না।”
তাহলে তুই এখানেই থাক, বলে আমরা দু’জন সামনে এগোতে লাগলাম। পরে ঠিকই পিছু পিছু আসল। সুড়ঙ্গটা অনেক পুরনো দিনের মনে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সুরঙ্গের প্রাচীর ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ে আছে। ক্রমে পুরনো দিনের ইতিহাসে ঢুকে পড়ছি বলে মনে হল। ক্রমশ অন্ধকার হাতড়ে কোন রকমে পথ চলছি। আমাদের ভিতর একজন সিগারেটখোর থাকলে মন্দ হতো না! তাহলে অন্তত একটা লাইটার পাওয়া যেত। যদিও মজনু কবিতার প্রয়োজনে মাঝে মাঝে দু-একটা টান মেরে থাকে তবে চেইন স্মোকার নয়। ভাব আনার জন্য ও এ কাজটা করে থাকে।
বাতাসে কেমন যেন একটা কটু গন্ধ টের পেলাম। ইঁদুর আর চিকাগুলো আমাদের সাড়া পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ব্যাপারটা ঐতিহাসিক থেকে ভূতোরে দিকে যেতে লাগল। এক ঝাক চামচিকার উড়োউড়িতে পরিবেশটা আরো ঘোরতর হয়ে উঠল। অমলটা আবার চামচিকাদের পিছু পিছু দৌড় দিল। দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, “চামচিকাদের পিছু পিছু গেলে পথ একটা পাওয়া যাবেই। তাড়াতাড়ি দৌড়া। চামচিকারা পথ চেনে।”
আমি বললাম, “চামচিকারা যে পথ চেনে সে পথে তুই যেতে পারবি বলে মনে হয় না। যদি না চামচিকা হস।”
সত্যিই তাই হল। চামচিকা গুলো সুরঙ্গের উপরের সরু ছিদ্র দিয়ে ঠিকই বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে পথে মানুষের যাওয়া অসম্ভব। মজনু আর অমল দুটোকে হতাশ মনে হল।
সিদ্দিককে নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তা হলো। বেচারা যে কোন বিপদে পড়েছে! অবশ্য আমরাও কী কম বিপদে আছি ? যতদূর ভাবছি সব জঘন্য লাগছে। কেন যেন মনে হচ্ছে আমাদের মতো সিদ্দিকও সুড়ঙ্গ বন্দী। এখান থেকে উদ্ধার পাওয়াই এখন আসল কাজ।
মজনু বলল, “কবরে এর থেকেও বেশি অন্ধকার হবে নাকি রে?”
“আমি মরে কবরে গিয়েছি যে জানব কবরে কেমন অন্ধকার!” খুব রাগ নিয়েই উত্তরটা দিলাম।
অমল বলল, “নিশ্চয় এ সুরঙ্গে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে।”
“আমিও তাই ভাবছি। একবার ভেবে দেখ তো, ডাকাতগুলো সবার চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে যায়, এটা কীভাবে সম্ভব? এতগুলো মানুষের চোখকে ফাঁকি দেয়া সোজা ব্যাপার না!”
মজনু ফ্যাকাশে গলায় বলল, “সব ভেলকি বাজি। নিশ্চয় জাদু জানে। এই জাদুতে আমরাও আটকে গেছি।”
“না মোটেও তা নয়। পুরো ব্যাপারটার সাথে সুরঙ্গ জড়িয়ে আছে। দেখি কতদূর সত্য হয়।”
অমল ভয় পাওয়া কন্ঠে বলল, “তুই কী গরুর ডাকের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিস?”
মজনু তামাশা করে বলল, “তোর বোধ হয় গরু রোগ হয়েছে তাই গরুর আওয়াজ শুনতে পাস।”
কিন্তু একটু পরে আমি শুনলাম ছাগলের আওয়াজ। মজনু শুনল ভেড়ার ডাক। আশেপাশে কোথাও গরুর হাট আছে নাকি! সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে গরু বাজারে ঢুকে পড়ছি কিনা সন্দেহ হল। গরু ছাগলের আওয়াজ ক্রমেই স্পষ্ট হতে লাগল। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মানুষের কণ্ঠও শুনতে পেলাম। ভয় আর উৎকণ্ঠায় সামনে এগিয়ে চললাম।
অমল আর মজনুকে সাবধান করে দিয়ে বললাম, “বিড়াল হয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর। একটা শব্দও যাতে না হয়। দরকার হলে জুতো খুলে ফেল। কাশি আসুক আর পিঁপড়ে কামড়াক না কেন, কোন শব্দ করা যাবে না। ধরা পড়লে জান নিয়ে ফিরতে পারবি না!”
মজনুটা এমন সিরিয়াস কথার ভিতরেও বলল, “জান-প্রাণ দরকার নেই এই হাত নিয়ে ফিরতে পারলে হয়। তাহলে অন্তত কবিতা লিখে জীবনটা পার করতে পারব।”
মজনুর এই আবেগী কথা শুনে মনটা পুরো পানিভাত হয়ে গেল। কিন্তু কাজের সময় অনুভূতির কোন দাম নেই তাই ব্যাপারটা মুহূর্তে ঝেড়ে ফেললাম।
অমলটা আবার দলনেতার ভান করে বলল, “বন্ধুরা যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এই পথে পা বাড়িয়েছি তা ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও.............”
কথাটা শেষ করতে দিলাম না। মাথায় দুটো চাটি মেরে বললাম, “তোরা রক্ত দিলে দে আমি পারব না। রক্ত দিলেও কাজ হবে না। সে রক্ত বৃথা যাবে। যা করার বুদ্ধি দিয়ে করতে হবে।”
আমার কথা শুনে অমলের ভাব পুরো মাটি হয়ে গেল।
ছাগল আর গরুর আওয়াজ ধরে সামনে এগোতে লাগলাম। যেতে যেতে সামনে পড়ল ত্রিমুখী সুরঙ্গ, তিন দিকে তিন মুখ গিয়েছে। কোন দিকে যাব দ্বিধা-দ্বন্দে পড়ে গেলাম।
অমল বলল, “তিন জন তিন দিকে গেলে কেমন হয়?”
মজনু বলল, “না, ভাই আমি একা যেতে পারব না। কোথায় কোন বিপদে পড়ি কে জানে।”
আমি বললাম, “তিনজন আলাদা না হওয়াই ভাল। একজনকে হারিয়েছি আর কাউকে হারানো যাবে না। নাক বরাবর রাস্তা দিয়ে চল। আর গরু ছাগলের হাট সামনেই মনে হচ্ছে।”
নাক বরাবর সোজা নিঃশব্দে হেঁটে গেলাম। কিন্তু সামনে গিয়ে যা দেখলাম তাতে অবাক, বিস্ময়, হতবাক হয়ে গেলাম!
No comments:
Post a Comment