Wednesday, September 14, 2011

সাত

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা পড়াটা আমার কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজ। কিন্তু এই কাজটাই আমায় প্রতিদিন বাধ্য ছেলের মত করতে হয়। পত্রিকার কোথায় কী লিখেছে আমায় পড়ে শুনাতে হয় আব্বুকে।
আব্বু বলে, “জোরে জোরে পত্রিকা পড়লে নাকি স্পেলিং ঠিক হয়।”
মাঝে মাঝে ভাবি, রবীন্দ্রনাথের বাবাও হয়ত এরকম ধরে ধরে পত্রিকা পড়াত।
পত্রিকার পাতায় আজ একটা রিপোর্ট দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। আমদের শিবপুর নিয়ে বাজে একটা রিপোর্ট ছেপেছে।
                               শিবপুরে সন্ত্র্রাসীদের ঘাঁটি
কুমিল্লা জেলার শিবপুর থানা দিনে দিনে সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। এমন কোন অপরাধ নেই তারা করছে না। ডাকাতি, শিশু নির্যাতন থেকে শুরু করে চোরা-কারবারীও হচ্ছে নিয়মিতভাবে। এ পর্যন্ত সেখানে অসংখ্য ডাকাতিসহ তিনটি খুন ও চারটি ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ধারণা করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এ ঘটনা ঘটাচ্ছে। পুলিশের হাজারো তৎপরতার ভিতর অপরাধ চক্র তাদের অপরাধ কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের এ ব্যর্থতা সাধারণ জনগণকে ভাবিয়ে তুলছে। জনগণ এ অবস্থার প্রতিকার চায়।
মাঝে মাঝে ভাবি এ দেশে পুলিশরাই বোধ হয় সবচে‘ বড় অপরাধী। সবার আগে  এদের  জেলে ঢুকানো দরকার। রিপোর্টটা পড়ে অবশ্য একটা উপকার হল, নিজের ভেতর কেমন যেন ফেলুদা ভাব এসে গেল। মনে হল জেমস বন্ডের মতো কিছু একটা করে ফেলি। কিন্তু এখন কিছুই করা সম্ভব নয়, স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে কিছু একটা করব বলে স্থির করলাম।
আজ দেরি না করে তাড়াতাড়ি স্কুলে চলে এলাম। মাঠের পুবকোণে দেখি ইভটেজার রকি মাথা উঁচু করে কপালে একটা পয়সা রেখে সূর্যের দিকে মুখ করে অসুরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। একে দেখতে অদ্ভূদ লাগছে।
আমায় দেখে বলল, “সাবধান! কাছে মাত আও। পিটিয়ে টেন্ডি বাজাব। শত্রুতা যা হবার পরে হবে। হে খোদা, এইবারের মতো বাঁচাও।”
তারপর বিড়বিড় করে কাকে যেন কী বলল নাকি গালি দিল বুঝলাম না।
পরে জানতে পারলাম কোন মেয়ের উপর যেন কুদৃষ্টি দেয়ার কারণে শফিক স্যার ওকে এ শাস্তি দিয়েছে। ঐ মেয়ে নিজেই নাকি স্যারের কাছে নালিশ করেছে। অমল ওকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “ইভটিজিংয়ের মতো জঘন্য কাজ করতে তোর লজ্জা লাগে না?”
রকি মুখে প্রেমিকের ভাব এনে বলল, “প্রেম মানে না কোন বাঁধা। প্রেমিক এগিয়ে চলে ঝড়ের গতিতে। তার কোন দিক নেই, সীমা নেই। আর তোদের এসব বলেই বা লাভ কী! তোরা তো এডাল্টই হসনি।”
অমল খোঁচা দিয়ে বলল, “এডাল্ট হইনি তাই রক্ষা। নইলে তোর মতো ‘আমি একজন ইভটেজার’ লেখা সাইনবোর্ড গলায় ঝুলিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হতো।”
খোঁচাটা ভালই কাজে লাগল কারণ রকির মুখটা একদম পচা আলুর মতো হয়ে গেছে। রকির বাবা-মা ওর নামটা একদম সার্থক রেখেছে, শত লাঞ্চনা সইবে তবু পাথরের মতো ইভটিজিং ছাড়বে না।
টিফিন পিরিয়ডে সিদ্দিকের কাছে খবর পেলাম ডাকাতরা নাকি শ্যামল চাচাদের বাড়িতে হানা দিয়েছিল। কিন্তু মুহিদ ভাই লোক নিয়ে রেডি থাকায় ডাকাতরা আর বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেনি। উল্টো মুহিদ ভাইয়ের লোকেরা ওদের তাড়া করে গিয়েছিল। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল, অল্পের জন্য ধরেও ফেলত। কিন্তু মাঠের ওপারে গিয়ে নাকি চোখের সামনে ডাকাত দল উদাও হয়ে গেছে! ওরা স্পষ্ট ডাকাতদের দেখছিল, কিন্তু চোখের সামনে হঠাৎ যেন মাটি ফুড়ে ডাকাত দল হাওয়া! ঐ জায়গায় অনেক খোঁজাখুজি করেও নাকি ডাকাতদের টিকিটির চিহ্নও পাওয়া যায়নি। ডাকাতদের ভেলকি বাজি দেখে সবাই টাকশি খেয়েছে।
ব্যাপারটা খুব অদ্ভূদ লাগল। এটা কেমন করে সম্ভব, একদল ডাকাত মাটি ফুঁড়ে হাওয়া হয়ে গেছে! জাদু ছাড়া এ কখনো সম্ভব নয়। অনিক বলল, “নিশ্চয় ওরা বানিয়ে বলেছে। আমরা যদি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখি, তাহলেও এর সত্যতা পাওয়া যাবে না। এসব ক্ষেত্রে নিউটন কিংবা আইনস্টাইনের কোন সূত্র আছে বলে মনে হয় না।”
নিশি ওকে থামিয়ে বলল, “তাহলে তুই একটা বানিয়ে নে। মনে হচ্ছে, ডাকাতগুলো কোথাও লুকিয়ে পড়েছিল তাই ওরা ভাবল মাটি ফুঁড়ে চলে গেছে।”
এ সময় অমল বলল, “মাটি ফুঁড়ে চলে যাওযা অসম্ভব নয়! মহাভারতে আছে শ্রী শীতারাণী মাটি ফুঁড়ে চলে গিয়েছিল।এ নিয়ে........”
অনিক একে থামিয়ে বলল, “ইস্ কী একটা পেয়েছে মহাভারত! যার এক পার্সেন্টও বৈজ্ঞানিক সত্যতা নেই।”
অমল রেগে বলল, “দেখ মহাভারত নিয়ে বাজে কথা বলবি না। নির্ঘাত ধ্বংশ হয়ে যাবি!”
“উওফ, তোরা চুপ করবি?” বলে নিশি চেঁচিয়ে উঠল। চেঁচালে নিশিকে অনেক সুন্দর দেখায়, ব্যাপারটা আমি ভালভাবে লক্ষ্য করলাম।আসলে এক এক মানুষের সৌন্দর্য একেকভাবে ফুটে উঠে।
সবাই চুপ করার পর আমি বললাম, “এখানে বসে আকাশ-পাতাল ভেবে কাজ নেই। পুরো ব্যাপারটি আমাদের তদন্ত করে বের করতে হবে। কোথায়, কী ঘটেছে সব সূক্ষ্মভাবে বিশেলষণ করতে হবে। সব রহস্যের সমাধান ইনশাল্লাহ আমরাই করে ফেলব।”
নিশি আমার চুলগুলো ঝাড়া দিয়ে বলল, “খারাপ বলিসনি।”
চিকা ইরফান ভয় পাওয়ার সুরে বলল, “ডাকাতদের সাথে ফাজলামো করা ঠিক হবে কী?”
মজনু সুর মিলিয়ে বলল, “ঠিক হবে না।”
আমি বললাম, “ফাজলামো কিসের রে? ফেলুদা যে রহস্য উদঘাটর করে এগুলো কি ফাজলামো? শার্লক হোমস কী ভেরেন্ডা ভাজি খাওয়ার জন্য তদন্ত করে। বুকে একটু সাহস রাখতে শিখ। আর এই অকর্মার মতো জীবন রেখে কী করব!! শেম্, শেম্। তোদের কাপুরুষতাকে ধিক্কার জানাই। তোরা কেউ যদি এগিয়ে না আসিস তাহলে আমি একাই লড়ে যাব।”
আমার কথায় সবগুলোর টনক নড়েছে বোধ হয়। চিকা ইরফান মুখটা পচা আলুর মতো করে ফেলল। ক্ষুদ্র বালক সিদ্দিক গলা বাড়িয়ে বলল, “কেউ তোর সাথে না থাকুক আমি অন্তত আছি।”
তারপর দেখলাম একে একে সবাই ‘আমিও’ বলে আমার দলে ভিড়তে থাকে। চার ফুট এক ইঞ্চি বালক সিদ্দিকের সাহস দেখে সবাই হয়ত লজ্জা পেয়ে রাজি হতে বাধ্য হয়েছে।
আমি দলনেতার সুরে সবাইকে বললাম, “শোন বন্ধুরা, আমাদের মাদার ল্যান্ড আজ বিপদের মুখে, ডাকাতের হাতে বিপন্ন। আর জানিস তো, জননী-জন্মভূমি স্বর্গ অপেক্ষা মহিয়সী। একে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। আর এ জন্য সমূহ বিপদ মোকাবেলা করতে হতে পারে। প্রয়োজনে কুকুরের কামড় খেতে হবে, স্বর্গে বাসও হতে পারে!”
সিদ্দিকটা বাড়িয়ে বলল, “মহিষের বমি কিংবা ছাগলের ছনাও খাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”
সিদ্দিককে থামিয়ে বললাম,“তো বন্ধুরা, তারপরও আমাদের গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে যেতে হবে। আর আজ থেকেই আমাদের ইনভেস্টিগেশন শুরু। এসো সবাই হাত মিলাই।”
মজনু আমায় টেনে নিয়ে বলল, “দেখ তোদের সাথে যোগ দিয়েছি ভাল কথা। কুকুরের কামড়েও সমস্যা নেই কিন্তু মহিষের বমি আর ছাগলের ছনাটা আমার একদম পেটে সয় না।”
আমি হতাশ হওয়ার ভান করে বললাম, “কী আর করা। তোর জন্য তাহলে কুকুরের কামড়ই বরাদ্দ রইল।” কথাটা শুনে মজনু খুশিই হয়ে গেল।
টিফিন পিরিয়ডের পর দুটো ক্লাস হয়ে স্কুল ছুটি হয়ে গেল। নিশি, ঝুমুর, অনিক আর চিকা ইরফানকে পাঠালাম এলাকায় যতগুলো ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে তার তথ্য জেনে আসতে। বিশেষ করে শ্যামল চাচাদের বাড়িতে। আমি, সিদ্দিক, মজনু আর অমল গেলাম মাঠের ওপারে তদন্ত করার জন্য।

No comments:

Post a Comment