শুক্রবার দিন। তাই ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরিই হল। বিছানায় বসেই ভাবলাম, নিশির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। কিন্তু ওর সামনে যাওয়ার মত সাহসই আমার নেই। তাছাড়া সে আমায় ক্ষমা করবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। যা রাগি মেয়ে উল্টা-পাল্টা কিছু বললে উত্তরও দিতে পারব না। আর যদি ঝাড়– কিংবা ঝাঁটা নিয়ে তেড়ে আসে তাহলে তো কথাই নেই। প্রেস্টিজ যে কোথায় যাবে, ভাবা যায় ! এ সামান্য ব্যাপার নিয়ে যতক্ষণ ভাবলাম ততক্ষণে হয়ত তিনটা কবিতা লিখে ফেলা যেত। কিন্তু তারপরও কবিতার দিকে হাত বাড়ালাম না।
আমার জায়গায় ফেলুদা থাকলে নিশ্চয় নতুন একটা আইডিয়া বের করে ফেলত। অবশ্য ফেলুদা আমার মতো বোকামিটা করতো না নিশ্চয়। ফেলুদার মাথার দুই একটা বুদ্ধিও যদি আমার মাথায় আসত তাহলে হয়ত অনেক বিপ্লবের সমাধান করা যেত। আর টেনিদা হলে নিশ্চয় বিজ্ঞের মতো একগাদা উক্তি ছাড়ত।
বন্ধুদের ভিতর অনিক একমাত্র আমার বাড়ির পাশে থাকে। বলতে গেলে, ও আমার সকল কাজের সঙ্গী। বিজ্ঞানের সকল বিরক্তিকর বিষয়ে ওর আগ্রহ। নতুন কোন যন্ত্র দেখলে সেটার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব খুলে কী আছে দেখতে চায়। আমি আর অনিক মিলে একটা ওষুধ আবিষ্কার করেছিলাম। যেটা কুকুরের পাগলামি রোগ নিরাময় করে। আমাদেও গাঁয়ের হাসু পাগলার পাগলামি ভালো করার জন্য ওষুধটা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু ওষুধটা গেলানোর পর তার পাগলামি আরো বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের দেখলেই তেড়ে আসে।কিন্তু হাসু পাগলার কুকুরটার পাগলামি ঠিকই ভালো হয়েছিল। গতবারের আন্তঃজেলা বিজ্ঞানমেলা প্রতিযোগিতায় আমাদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটা দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিল। বর্তমানে আমরা ‘লাফিং গ্যাস’ নিয়ে কাজ করছি। গরু-ছাগল তো হাসে না, লাফিং গ্যাস দিয়ে এদের হাসানো যায় কিনা ভাবছি।
অনিক যে শুধু বিজ্ঞানের কলকব্জা আর থিওরির হিসাব রাখে তা নয়। সব দিকেই ওর খেয়াল থাকে। আমি ভাবি স্কুলের অনেক ব্যাপারই ও জানে না কিন্তু গল্প শুরু করলে উল্টো আমায় আরো বেশি শুনিয়ে দেয়। তাই নিশির ব্যাপারে পরামর্শ নিতে অনিকই একমাত্র সহায়। এছাড়া আর কারো কাছে শুভবুদ্ধি পাব বলে মনে হল না। একটা শার্ট পড়ে তাই অনিকদের বাড়ি চলে এলাম।
অনিকের ঘরে গিয়ে দেখলাম ও একটা পাথর নিয়ে কী যেন করছে। একবার পাথরটাকে উপরে মারছে তারপর সেটা সোজা এসে ওর মুখে পড়ছে। ওর এই ছেলেখেলার কোন মানে বুঝলাম না।
তাই জিজ্ঞেস করলাম,“পাথর খাওয়ার প্রাকটিস করছিস নাকি?”
আমায় দেখে ও মুখ থেকে পাথরটা বের করে বলল,“কৃষগহ্বর নিয়ে ভাবছি। কৃষ্ণ গহ্বর জিনিসটা আসলে খুবই জটিল। সবই আলোর খেলা। কৃষ্ণগহ্বর থেকে কোন বস্তু ফিরে আসে না কেন, ওটাই মাথায় ঢুকছে না। মনে কর, কোন একটা বস্তু শক্তির প্রভাবে.................”
আমি ওকে থামিয়ে বললাম, “থাক, থাক আর বলতে হবে না। এগুলো আপাতত আমার মাথায় ঢুকছে না।”
“ও হ্যাঁ, একটা কথা মনে পড়েছে। জানিস, নিউটনের আগে মহাকর্ষ বল সম্পর্কে ইবন হাইসাম ধারণা দিয়েছিল। দেখ, বিজ্ঞানের ইতিহাসকে কেমন, করে বিকৃত করা হয়েছে। বীজগনিত, ভূগোল, রসায়ন আর পদার্থ বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদানের কথা শুনলে পুরো টাকশি খাবি। পশ্চিমা শয়তানগুলো সব পাল্টে দিয়েছে। নিম গাছ প্রথম জন্মেছে আমাদের দেশে অথচ এর পেটেন্ট নেয় ওরা। ভাবতে পারিস, কত অবিচার।”
ওর কথাগুলো চিন্তা করার মতো হলেও বর্তমানে আমার মস্তিষ্কে কোন প্রভাব পড়ল না। কবিতার আলোচনা হলেও হতো তাহলে বেশ ভাব নিয়ে কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কিংবা কায়কোবাদের ‘মহাশ্মশান’ থেকে কিছু উচু দরের কথা শুনিয়ে দিতাম। শেষে বাধ্য হয়ে বললাম, তোর এই তত্ত্বালোচনা পরে হবে। আগে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। কাজ না অবশ্য, ঝামেলার সমাধান।
“ঝামেলাটা কী বলতো? নিশ্চয় নিশির সাথে।”
“নিশির সাথেই যে ঝামেলা কেমন করে বুঝলি?”
“এতো সোজা ব্যাপার। মনে কর বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতার আড়ালেই ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। আপেক্ষিকভাবে কোন বস্তুকে ....”
“তুইতো খুব ঝামেলা শুরু করেছিস। কিছু বলতে গেলেই শুধু বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান। তোর মাথায় এছাড়া অন্য কিছু নেই।”
“এটা তুই কি বললি? মানুষের সমস্ত জীবন জুড়েই তো বিজ্ঞান। আইনস্টাইন, নিউটন কিংবা এডিসনের মতো বিজ্ঞানীরা....”
“আবার!”
“ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। নিশির কোন নাম্বার চাই তো? এই নে। সামনে যাওয়ার সাহস না থাকলে তাহলে মেসেজে সরি বলতে পারিস। মেয়েদের সাথে ঝামেলা করে লাভ নেই। উল্টো ফ্যাসাদে পড়বি। তারচেয়ে বন্ধুত্ব করে ফেল, সেটাই ভাল।”
“শালা, তুই সব জেনেও ঢং করছিলি কেন? আর তোকে এগুলো কে বলল?”
“কে আর বলবে, নিশি থেকেই সব জেনেছি। তুই না বললে কি হবে নিশি ঠিকই আময় ফোন করে সব বলেছিল।”
“করেছিল বুঝি? আমায় নিয়ে কিছু বলেছে?”
“না ,তেমন কিছু বলেনি।”
“তাই । কিছুই বলেনি না?”
নিশির ফোন নাম্বারটা নিয়ে সোজা আমার ঘরে চলে এলাম। মোবাইল নিয়ে বসলাম মেসেজ লিখব বলে। কিন্তু হায়, মেসেজে কী লিখলে যে ভাল হবে তাই বুঝে উঠতে পারলাম না। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর লিখলাম-“কাল যে ব্যাপারটা ঘটেছিল তার জন্য আমি নিতান্তই দুঃখিত এবং শঙ্কিত। কাজটা আমার করা উচিত হয়নি। তাই বিশেষভাবে ক্ষমাপ্রার্থী -শিশির।” তারপর সেন্ড করে দিলাম নিশির নাম্বারে। উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করে রইলাম, উত্তরের আশায়। অনেকটা তীর্থের কাকের মত।
কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো তবু মেসেজের কোন উত্তর এল না। সারাদিন মনে হল এই বুঝি মেসেজ এলো তাই মোবাইলের কোন সংকেত ছাড়াই ইনবক্স ঘাটতে হল। সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন উত্তর না পেয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। যশপাড়ার সাথে আজ টুনামেন্টে খেলার কথা ছিল। মোমেনের বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও খেলতে গেলাম না। নিজেকে স্বান্তনা দিয়ে বললাম, “ইস উত্তর না দিলে মনে হয় মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে! দোষ করেছি ক্ষমা চেয়েছি, তাতেও মান না ভাঙ্গলে আমি কি করব।” এসব ভেবে পরক্ষণেই আবার মনটা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ব্যাপারটা কাটার মত বিধতে লাগল।
সন্ধ্যাবেলা আমি যখন বার বার পড়ার চেষ্টা করেও পড়তে পারছিলাম না তখন আমার ছোটবোন মিশু এসে বলল,“ভাইয়া, তুই কি ছেকা খেয়েছিস?”
“ছেকা খেয়েছি মানে?”
“জানিস ভাইয়া, আজ নুসরাত বলেছে প্রেমে ছেকা খেলে নাকি মানুষের মন খারাপ থাকে। তোর মন খারাপ তো তাই বললাম।”
“বেশ তো কথা শিখেছিস। এমন লাথি মারব দাঁতগুলো পড়ে এই বয়সে বুড়ি হবি। পাজি মেয়ে। ভাল কথা শিখতে পারিসনে।”
আমার বকুনি খেয়ে মেয়েটা একবার ভেংচি কেটে রুম থেকে চলে গেল। ছোট ভাই বোনের জ্বালাতন যে কত সে আমি হারে হারে বুঝি। এই মেয়ের আমার প্রতি টান থাকলেও উচিত কথা বলতে আমায়ও ছাড়ে না। আমার ছোট ভাই হৃদয়টা আমার সকল গোপন কথা বাবা-মার কাছে ফাস করে দেয়।
রাত দশটায় আব্বু যখন আমার মোবাইলের কললিস্টে মেয়েদের নাম্বার খোঁজায় ব্যস্ত, সে সময় একটা মেসেজ এল। কে পাঠাল জানি না, তারপরও মনে হল নিশি। আব্বুর হাতে মোবাইল তাই আত্মারাম খাঁচাছাড়া। পুরোদমে আল্লাহ-নবীর নাম জপে গেলাম। কিন্তু আব্বু তেমন কিছু না বলে আমার হাতে মোবাইলটা দিয়ে বললেন,“নিশি মেসেজ পাঠিয়েছে।” আমি শুধু চেয়েই রইলাম, মেসেজটা খোলা হয়নি বলে হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। আব্বু আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “নিশি কে রে? এ নামে আগে তো তোর বন্ধু শুনিনি।”
আমি আমতা আমতা করে বললাম, “স্কুলে নতুন এসেছে তো।”
আব্বু কেমন যেন সন্দেহের সুরে বললেন, “নাম শুনে তো কেমন যেন মেয়ে মেয়ে লাগে । কী অদ্ভুদ! ইদানিং নাম শুনে ছেলে মেয়ে আলাদা করা যায় না।” বলতে ইচ্ছে করছিল নিশি ছেলে নয় মেয়েই। কিন্তু নিজের বিপদ কী নিজেই ডেকে আনতে পারি বলো?
আব্বু চলে যাওয়ার পর সাথে সাথেই মোবাইলটা নিয়ে বসলাম। ইনবক্স ওপেন করে মেসেজটা পড়তেই থ বনে গেলাম। এতে লেখা আছে,- “শালা, থাপ্পড় মারবি তো আস্তে দিলেই হয়। অবশ্য তোর মতো চ্যাংড়ার হাতে যে এত শক্তি, থাপ্পড়টা না খেলে বুঝতাম না। বন্ধুদেরে ভিতর ক্ষমা কিসের রে? মারব চাট্রি। ও হ্যাঁ, মোবাইলটা আম্মুর তো তাই উত্তর দিতে দেরি হল। রাগ করিস নে- নিশি।” আমায় চ্যাংড়া বলেছে তো কী হয়েছে, তারপরও মেসেজটা পড়ে মনে হল মন একটা পাথর সরে গেছে। তবে মেয়েটা এত সুন্দর মনের মানুষ ভেবে খুব দুঃখ হল। কতজনে এত বন্ধুসুলভ হতে পারে? আর আমি কিনা এই মেয়ের উপর হাত তুলেছি ভেবেই খারাপ লাগল।
এর মেসেজের একটা সুন্দর জবাব দিব বলে ভাবছিলাম। কিন্তু সুন্দর কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না। তাই ভাবতে ভাবতে রাত কাবার।
আমার জায়গায় ফেলুদা থাকলে নিশ্চয় নতুন একটা আইডিয়া বের করে ফেলত। অবশ্য ফেলুদা আমার মতো বোকামিটা করতো না নিশ্চয়। ফেলুদার মাথার দুই একটা বুদ্ধিও যদি আমার মাথায় আসত তাহলে হয়ত অনেক বিপ্লবের সমাধান করা যেত। আর টেনিদা হলে নিশ্চয় বিজ্ঞের মতো একগাদা উক্তি ছাড়ত।
বন্ধুদের ভিতর অনিক একমাত্র আমার বাড়ির পাশে থাকে। বলতে গেলে, ও আমার সকল কাজের সঙ্গী। বিজ্ঞানের সকল বিরক্তিকর বিষয়ে ওর আগ্রহ। নতুন কোন যন্ত্র দেখলে সেটার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব খুলে কী আছে দেখতে চায়। আমি আর অনিক মিলে একটা ওষুধ আবিষ্কার করেছিলাম। যেটা কুকুরের পাগলামি রোগ নিরাময় করে। আমাদেও গাঁয়ের হাসু পাগলার পাগলামি ভালো করার জন্য ওষুধটা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু ওষুধটা গেলানোর পর তার পাগলামি আরো বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের দেখলেই তেড়ে আসে।কিন্তু হাসু পাগলার কুকুরটার পাগলামি ঠিকই ভালো হয়েছিল। গতবারের আন্তঃজেলা বিজ্ঞানমেলা প্রতিযোগিতায় আমাদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটা দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিল। বর্তমানে আমরা ‘লাফিং গ্যাস’ নিয়ে কাজ করছি। গরু-ছাগল তো হাসে না, লাফিং গ্যাস দিয়ে এদের হাসানো যায় কিনা ভাবছি।
অনিক যে শুধু বিজ্ঞানের কলকব্জা আর থিওরির হিসাব রাখে তা নয়। সব দিকেই ওর খেয়াল থাকে। আমি ভাবি স্কুলের অনেক ব্যাপারই ও জানে না কিন্তু গল্প শুরু করলে উল্টো আমায় আরো বেশি শুনিয়ে দেয়। তাই নিশির ব্যাপারে পরামর্শ নিতে অনিকই একমাত্র সহায়। এছাড়া আর কারো কাছে শুভবুদ্ধি পাব বলে মনে হল না। একটা শার্ট পড়ে তাই অনিকদের বাড়ি চলে এলাম।
অনিকের ঘরে গিয়ে দেখলাম ও একটা পাথর নিয়ে কী যেন করছে। একবার পাথরটাকে উপরে মারছে তারপর সেটা সোজা এসে ওর মুখে পড়ছে। ওর এই ছেলেখেলার কোন মানে বুঝলাম না।
তাই জিজ্ঞেস করলাম,“পাথর খাওয়ার প্রাকটিস করছিস নাকি?”
আমায় দেখে ও মুখ থেকে পাথরটা বের করে বলল,“কৃষগহ্বর নিয়ে ভাবছি। কৃষ্ণ গহ্বর জিনিসটা আসলে খুবই জটিল। সবই আলোর খেলা। কৃষ্ণগহ্বর থেকে কোন বস্তু ফিরে আসে না কেন, ওটাই মাথায় ঢুকছে না। মনে কর, কোন একটা বস্তু শক্তির প্রভাবে.................”
আমি ওকে থামিয়ে বললাম, “থাক, থাক আর বলতে হবে না। এগুলো আপাতত আমার মাথায় ঢুকছে না।”
“ও হ্যাঁ, একটা কথা মনে পড়েছে। জানিস, নিউটনের আগে মহাকর্ষ বল সম্পর্কে ইবন হাইসাম ধারণা দিয়েছিল। দেখ, বিজ্ঞানের ইতিহাসকে কেমন, করে বিকৃত করা হয়েছে। বীজগনিত, ভূগোল, রসায়ন আর পদার্থ বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদানের কথা শুনলে পুরো টাকশি খাবি। পশ্চিমা শয়তানগুলো সব পাল্টে দিয়েছে। নিম গাছ প্রথম জন্মেছে আমাদের দেশে অথচ এর পেটেন্ট নেয় ওরা। ভাবতে পারিস, কত অবিচার।”
ওর কথাগুলো চিন্তা করার মতো হলেও বর্তমানে আমার মস্তিষ্কে কোন প্রভাব পড়ল না। কবিতার আলোচনা হলেও হতো তাহলে বেশ ভাব নিয়ে কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কিংবা কায়কোবাদের ‘মহাশ্মশান’ থেকে কিছু উচু দরের কথা শুনিয়ে দিতাম। শেষে বাধ্য হয়ে বললাম, তোর এই তত্ত্বালোচনা পরে হবে। আগে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। কাজ না অবশ্য, ঝামেলার সমাধান।
“ঝামেলাটা কী বলতো? নিশ্চয় নিশির সাথে।”
“নিশির সাথেই যে ঝামেলা কেমন করে বুঝলি?”
“এতো সোজা ব্যাপার। মনে কর বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতার আড়ালেই ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। আপেক্ষিকভাবে কোন বস্তুকে ....”
“তুইতো খুব ঝামেলা শুরু করেছিস। কিছু বলতে গেলেই শুধু বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান। তোর মাথায় এছাড়া অন্য কিছু নেই।”
“এটা তুই কি বললি? মানুষের সমস্ত জীবন জুড়েই তো বিজ্ঞান। আইনস্টাইন, নিউটন কিংবা এডিসনের মতো বিজ্ঞানীরা....”
“আবার!”
“ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। নিশির কোন নাম্বার চাই তো? এই নে। সামনে যাওয়ার সাহস না থাকলে তাহলে মেসেজে সরি বলতে পারিস। মেয়েদের সাথে ঝামেলা করে লাভ নেই। উল্টো ফ্যাসাদে পড়বি। তারচেয়ে বন্ধুত্ব করে ফেল, সেটাই ভাল।”
“শালা, তুই সব জেনেও ঢং করছিলি কেন? আর তোকে এগুলো কে বলল?”
“কে আর বলবে, নিশি থেকেই সব জেনেছি। তুই না বললে কি হবে নিশি ঠিকই আময় ফোন করে সব বলেছিল।”
“করেছিল বুঝি? আমায় নিয়ে কিছু বলেছে?”
“না ,তেমন কিছু বলেনি।”
“তাই । কিছুই বলেনি না?”
নিশির ফোন নাম্বারটা নিয়ে সোজা আমার ঘরে চলে এলাম। মোবাইল নিয়ে বসলাম মেসেজ লিখব বলে। কিন্তু হায়, মেসেজে কী লিখলে যে ভাল হবে তাই বুঝে উঠতে পারলাম না। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর লিখলাম-“কাল যে ব্যাপারটা ঘটেছিল তার জন্য আমি নিতান্তই দুঃখিত এবং শঙ্কিত। কাজটা আমার করা উচিত হয়নি। তাই বিশেষভাবে ক্ষমাপ্রার্থী -শিশির।” তারপর সেন্ড করে দিলাম নিশির নাম্বারে। উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করে রইলাম, উত্তরের আশায়। অনেকটা তীর্থের কাকের মত।
কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো তবু মেসেজের কোন উত্তর এল না। সারাদিন মনে হল এই বুঝি মেসেজ এলো তাই মোবাইলের কোন সংকেত ছাড়াই ইনবক্স ঘাটতে হল। সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন উত্তর না পেয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। যশপাড়ার সাথে আজ টুনামেন্টে খেলার কথা ছিল। মোমেনের বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও খেলতে গেলাম না। নিজেকে স্বান্তনা দিয়ে বললাম, “ইস উত্তর না দিলে মনে হয় মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে! দোষ করেছি ক্ষমা চেয়েছি, তাতেও মান না ভাঙ্গলে আমি কি করব।” এসব ভেবে পরক্ষণেই আবার মনটা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ব্যাপারটা কাটার মত বিধতে লাগল।
সন্ধ্যাবেলা আমি যখন বার বার পড়ার চেষ্টা করেও পড়তে পারছিলাম না তখন আমার ছোটবোন মিশু এসে বলল,“ভাইয়া, তুই কি ছেকা খেয়েছিস?”
“ছেকা খেয়েছি মানে?”
“জানিস ভাইয়া, আজ নুসরাত বলেছে প্রেমে ছেকা খেলে নাকি মানুষের মন খারাপ থাকে। তোর মন খারাপ তো তাই বললাম।”
“বেশ তো কথা শিখেছিস। এমন লাথি মারব দাঁতগুলো পড়ে এই বয়সে বুড়ি হবি। পাজি মেয়ে। ভাল কথা শিখতে পারিসনে।”
আমার বকুনি খেয়ে মেয়েটা একবার ভেংচি কেটে রুম থেকে চলে গেল। ছোট ভাই বোনের জ্বালাতন যে কত সে আমি হারে হারে বুঝি। এই মেয়ের আমার প্রতি টান থাকলেও উচিত কথা বলতে আমায়ও ছাড়ে না। আমার ছোট ভাই হৃদয়টা আমার সকল গোপন কথা বাবা-মার কাছে ফাস করে দেয়।
রাত দশটায় আব্বু যখন আমার মোবাইলের কললিস্টে মেয়েদের নাম্বার খোঁজায় ব্যস্ত, সে সময় একটা মেসেজ এল। কে পাঠাল জানি না, তারপরও মনে হল নিশি। আব্বুর হাতে মোবাইল তাই আত্মারাম খাঁচাছাড়া। পুরোদমে আল্লাহ-নবীর নাম জপে গেলাম। কিন্তু আব্বু তেমন কিছু না বলে আমার হাতে মোবাইলটা দিয়ে বললেন,“নিশি মেসেজ পাঠিয়েছে।” আমি শুধু চেয়েই রইলাম, মেসেজটা খোলা হয়নি বলে হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। আব্বু আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “নিশি কে রে? এ নামে আগে তো তোর বন্ধু শুনিনি।”
আমি আমতা আমতা করে বললাম, “স্কুলে নতুন এসেছে তো।”
আব্বু কেমন যেন সন্দেহের সুরে বললেন, “নাম শুনে তো কেমন যেন মেয়ে মেয়ে লাগে । কী অদ্ভুদ! ইদানিং নাম শুনে ছেলে মেয়ে আলাদা করা যায় না।” বলতে ইচ্ছে করছিল নিশি ছেলে নয় মেয়েই। কিন্তু নিজের বিপদ কী নিজেই ডেকে আনতে পারি বলো?
আব্বু চলে যাওয়ার পর সাথে সাথেই মোবাইলটা নিয়ে বসলাম। ইনবক্স ওপেন করে মেসেজটা পড়তেই থ বনে গেলাম। এতে লেখা আছে,- “শালা, থাপ্পড় মারবি তো আস্তে দিলেই হয়। অবশ্য তোর মতো চ্যাংড়ার হাতে যে এত শক্তি, থাপ্পড়টা না খেলে বুঝতাম না। বন্ধুদেরে ভিতর ক্ষমা কিসের রে? মারব চাট্রি। ও হ্যাঁ, মোবাইলটা আম্মুর তো তাই উত্তর দিতে দেরি হল। রাগ করিস নে- নিশি।” আমায় চ্যাংড়া বলেছে তো কী হয়েছে, তারপরও মেসেজটা পড়ে মনে হল মন একটা পাথর সরে গেছে। তবে মেয়েটা এত সুন্দর মনের মানুষ ভেবে খুব দুঃখ হল। কতজনে এত বন্ধুসুলভ হতে পারে? আর আমি কিনা এই মেয়ের উপর হাত তুলেছি ভেবেই খারাপ লাগল।
এর মেসেজের একটা সুন্দর জবাব দিব বলে ভাবছিলাম। কিন্তু সুন্দর কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না। তাই ভাবতে ভাবতে রাত কাবার।
No comments:
Post a Comment